মেধাবী মেয়েকে ঘিরে ছিল পরিবারের অনেক স্বপ্ন। মেয়েটি পড়াশোনা করে বড় হবে, পরিবারের অভাব ঘোচাবে—এমন আশাতেই অনেক কষ্ট করে মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছিলেন ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করা রেজাউল করিম। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু রাফিয়া আক্তার রুপা (১৫) গত ৯ সেপ্টেম্বর স্কুলে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়। দেড় মাস পার হলেও মেয়ের সন্ধান না পাওয়ায় দিশাহারা বাবা-মা। মেয়েকে ফিরে পেতে এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
রাফিয়া পুরান ঢাকার আরমানিটোলার নিউ গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারের দাবি, মেধাবী হওয়ায় সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করত। মেয়ের পড়াশোনায় যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তাকে ঢাকায় রেখে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন বাবা।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৬টায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া পূর্বপাড়ার বাসা থেকে স্কুলের উদ্দেশে বের হয় রাফিয়া। দুপুরে বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও সে আর ফেরেনি। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও মেয়ের সন্ধান না পেয়ে ১০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বাবা রেজাউল।
পরিবারের দাবি, জিডি করার দুদিন পর রাশেদা নামে এক নারী রেজাউলের মোবাইলে ফোন করে জানান, রাফিয়া তাদের কাছে রয়েছে। পরে ফোনের সূত্র ধরে মেয়েটির অবস্থান পটুয়াখালীর বাউফলে বলে জানতে পারে পুলিশ।
এ ঘটনায় ১৬ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেন রেজাউল। মামলায় মো. রায়হান সিকদার, তার বাবা মো. সেলিম ও মা রাশেদাকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই সাহিদী হাসান।
পরে পুলিশ বাউফলের গোসিংগা গ্রামে অভিযান চালায়। পরিবারের দাবি, অভিযুক্ত রায়হানের বাড়ি থেকে রাফিয়ার স্কুলের পোশাক ও পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। তবে ওই বাড়িতে রাফিয়াকে পাওয়া যায়নি।
রায়হানকে না পেয়ে পুলিশ তার মা-বাবাকে একদিনের মধ্যে রাফিয়াকে বাউফল থানায় হাজির করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এরপর থেকে ওই পরিবারের সদস্যদের আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন রেজাউল।
মেয়েকে ফিরে পেতে বাবার আকুতি
চুনকুটিয়া আমিনপাড়া এলাকায় ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করে সংসার চালান রেজাউল। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রাফিয়াকে ঘিরে ছিল তার অনেক আশা। সীমিত আয়ের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। এখন মেয়ের খোঁজে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তার।
রেজাউলের অভিযোগ, তিনি দরিদ্র হওয়ায় মেয়েকে উদ্ধারে পুলিশের যথেষ্ট তৎপরতা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে মেয়েকে পড়াশোনা করাচ্ছিলাম। আমি শুধু আমার সন্তানকে জীবিত ফিরে পেতে চাই।’
প্রশ্নের মুখে উদ্ধার তৎপরতা
অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলছাত্রীর নিখোঁজের ঘটনায় মামলা, সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত এবং স্কুল ড্রেস ও পরিচয়পত্র উদ্ধারের দাবি সামনে আসার পরও কেন তার সন্ধান মিলছে না—এ প্রশ্ন এখন পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও।
বাউফল থানার ওসি মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন, আসামিদের মোবাইল নম্বর এসআরবিতেও দেওয়া হয়েছে। তাদের ফোন বন্ধ থাকায় ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
রাফিয়াকে দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধার, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মেয়েটির বাবা রেজাউল।
