যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দেশজুড়ে বেসামরিক নাগরিকদের সংগঠিত করা, অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার করছে ইরানের কর্তৃপক্ষ। ‘জানফাদা’ নামে পরিচিত এই কর্মসূচির আওতায় স্বেচ্ছাসেবীদের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সহায়তার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে কর্মসূচিটি চালু করা হয়। বর্তমানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের বিভিন্ন শহরে এর কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও সব বয়সী নারী-পুরুষের জন্য এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
‘জানফাদা’ শব্দের অর্থ আত্মত্যাগকারী বা নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ব্যক্তি। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অধীন বাসিজ মিলিশিয়া এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সড়ক, চত্বর ও জনসমাগমস্থলে অস্থায়ী বুথ বসিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এসব প্রশিক্ষণে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের পাশাপাশি সরকার এবং এর ঘোষিত বিপ্লবী আদর্শ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তেহরান, ইসফাহান, জানজান, শিরাজ, কেরমান, মাশহাদ, বোজনুর্দ ও আহভাজসহ বড় ও ছোট বিভিন্ন শহরে জানফাদা কর্মসূচির আওতায় সমাবেশ ও সশস্ত্র মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চলতি মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান আলী কাউসারি জানান, তেহরানের অন্তত ১৪টি প্রধান চত্বরকে জানফাদা স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় আইআরজিসি। পাশাপাশি প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানীতে অন্তত এক থেকে তিনটি চত্বর ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে কতটি শহরে কর্মসূচিটি চলছে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।
দিনের বেলায় সমাবেশ ও মোটর শোভাযাত্রার পাশাপাশি রাতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। উত্তর ইরানের গিলান প্রদেশের এক বাসিন্দা আল জাজিরাকে জানান, প্রদেশটির বড় ও ছোট শহরের রাস্তায় নিয়মিত এসব কেন্দ্র দেখা যায়। নিরাপত্তার কারণে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
ওই বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো কখনো ছোট পুরস্কার জেতার প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের জীবন্ত গুলি ব্যবহার, ম্যাগাজিনে গুলি ভরা, পিস্তল ও অ্যাসল্ট রাইফেল প্রস্তুত করা এবং লক্ষ্যভেদ করে গুলি চালানোর পদ্ধতি শেখানো হয়।
তিনি জানান, এসব আয়োজনের সংগঠকদের মধ্যে বয়স্ক পুরুষের সংখ্যা বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাঁদের অনেককে প্রায় প্রতি রাতেই প্রধান চত্বরের আশপাশে জড়ো হতে দেখা যায়। এ সময় বিপ্লবী সংগীত বাজানো এবং মাইকে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
গত ১৫ অক্টোবর গিলান প্রদেশের রাশত শহরে রাতের এমন একটি সমাবেশের শব্দ ও সড়ক অবরোধ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা আপত্তি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একপর্যায়ে সংঘর্ষের চিত্র দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্যের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
শনিবার তেহরানের কাছাকাছি আলবোর্জ প্রদেশের কারাজ শহরের বাসিন্দাদেরও সতর্ক করা হয়। জানফাদা কর্মসূচির একটি মহড়ার কারণে সেখানে বিস্ফোরণের শব্দ ও বিকট আওয়াজ হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।
গত সপ্তাহে ইরাক সীমান্তবর্তী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশেও বড় পরিসরে কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি প্রাদেশিক রাজধানী সানানদাজে অনুষ্ঠিত শোভাযাত্রাকে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের মহড়া হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে বিদেশভিত্তিক কয়েকটি ইরানি মানবাধিকার সংগঠন এসব সশস্ত্র সমাবেশ ও প্রশিক্ষণকে ‘ভীতি প্রদর্শনের’ কর্মসূচি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, জানফাদা কর্মসূচির বিস্তার ঘটছে জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভের কয়েক মাস পর। ওই বিক্ষোভ দমনের সময় গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরান সরকার স্বীকার করেছে, দেশটির সব প্রদেশের ৪০০টির বেশি কাউন্টিতে বিক্ষোভ হয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনায় সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হিসেবে এসব বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছিল। বিক্ষোভ দমনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন অনুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদনে যে অভিযোগ তোলা হয়, তা-ও প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
কাতারে অবস্থিত জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিপ্লবপন্থী অংশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, বিপ্লব অনেকটা সাইকেল চালানোর মতো। পড়ে যাওয়া এড়াতে হলে প্যাডেল চালিয়ে যেতে হয়। জানফাদা কর্মসূচি এবং এর নেতারা প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
কামরাভার মতে, এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও জনসমাবেশ ইরানের নেতৃত্বের বিপ্লবপন্থী অংশকে রাজনৈতিক ও আদর্শিক আনুগত্যের প্রদর্শনীর সুযোগও করে দিচ্ছে।
ইরান সরকারের দাবি, জানফাদা কর্মসূচির ওয়েবসাইটে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন। তবে এই সংখ্যার পক্ষে কর্তৃপক্ষ কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, নিবন্ধনের এই সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
অন্যদিকে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বিদেশভিত্তিক কর্মীরা কর্মসূচির ওয়েবসাইটের সোর্স কোড বিশ্লেষণ করে চার লাখ নয়, বরং ৪০ লাখেরও কম নিবন্ধনের তথ্য পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নিবন্ধনের জন্য শুধু একটি ফোন নম্বর প্রয়োজন ছিল, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর বাধ্যতামূলক ছিল না।
গত সপ্তাহে লোরেস্তান প্রদেশের আইআরজিসি কমান্ডার নেমাতোল্লাহ বাঘেরি কর্মসূচিটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, সরকার যেমন জনগণকে সমর্থন করে, তেমনি জনগণও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবকে সমর্থন করে, সেটি দেখানোই এর লক্ষ্য।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে উদ্ধার অভিযান, সামাজিক সেবা এবং গণমাধ্যম ও আর্থিক সহায়তার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট চাপ কমাতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার কমানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় আট মাসের সংঘাতের পরও কর্মসূচি সম্প্রসারণে তৎপরতা বাড়িয়েছে ইরানের কর্তৃপক্ষ। এ সময়ে হাজারো মানুষের মৃত্যু, সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকট বৃদ্ধি এবং বেসামরিক অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জানফাদা কর্মসূচিতে শিশুদের অংশগ্রহণও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন স্কুলে এ কর্মসূচির কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত সপ্তাহে ইরানের শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি জানান, বাসিজ মিলিশিয়া ‘শিক্ষার্থী জানফাদা’ নামে শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে শিশুদের নিয়ে আরও কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অধ্যাপক কামরাভার মতে, এ ধরনের জনসম্পৃক্ততা রাষ্ট্রের প্রতি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন বাড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে যারা আগে থেকেই সরকারকে সমর্থন করেন, তাঁদের মধ্যে রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা আরও দৃঢ় করতে পারে এসব উদ্যোগ।
তার ভাষায়, এ ধরনের কর্মসূচি বিপ্লবের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্য সম্পর্কে বিদ্যমান সমর্থকদের বিশ্বাস জোরদার করে এবং বিপ্লবী নেতৃত্বের মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার মানসিকতাকে আরও গভীর করে।
