আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল (ছাত্রী) প্রতিযোগিতার ফাইনালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) খেলোয়াড়দের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এতে যবিপ্রবির ৯ জন খেলোয়াড় আহত হয়। প্রতিবাদে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে ম্যাচ বর্জন করে যবিপ্রবি নারী ফুটবল দল।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও যবিপ্রবির মধ্যে ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কর্তৃপক্ষ সকাল ১০টায় ম্যাচ শুরুর সিদ্ধান্ত জানালে দুই দলই তা মেনে নিয়ে মাঠে নামে।
তবে ম্যাচটি মারামারির কারণে শেষ করা সম্ভব হয়নি। যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
জানা গেছে, শুক্রবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দলে বিভিন্ন ‘খ্যাপ’ খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ এবং তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার অভিযোগ তোলা হয়। সেই অভিযোগের সমাধান না করেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের খেলোয়াড়দের ফাইনাল ম্যাচে অংশগ্রহণ করতে বলে।
অভিযোগ উঠেছে, খেলা শুরুর পর থেকেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শক ও খেলোয়াড়রা যবিপ্রবির খেলোয়াড়দের জঘন্যভাবে গালিগালাজ শুরু করে। পরে দ্বিতীয়ার্ধে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
যবিপ্রবির অভিযোগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড় জ্যোৎস্না তাদের খেলোয়াড় ফারিয়ার গলা চেপে ধরেন। এ সময় প্রতিবাদ করতে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। মারামারির একপর্যায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জ্যোৎস্না যবিপ্রবির আরেক খেলোয়াড় সামিয়ার গলা ও দুই হাত চেপে ধরেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড় ইলা যবিপ্রবির এক খেলোয়াড়কে ঘুষি ও থাপ্পড় মারেন। এছাড়া যবিপ্রবির অধিনায়ক সাদিয়াকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোৎস্না ও তাসলিমা মারধর করেন।
একই ঘটনায় যবিপ্রবির আঁখিকে মাটিতে ফেলে মারধর করা হয়, এতে তার নখ ভেঙে যায় বলে জানা গেছে। সাগরিকাকে রাস্তায় ফেলে মারধর, শশিকে পেটে লাথি এবং অন্তিকাকে ঘুষি মারার অভিযোগও উঠেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে। এছাড়া ছোয়াকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয়, এতে তার হাত ও হাঁটুতে রক্ত জমাট বাঁধে বলে যবিপ্রবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড় ইলা গাছের ডাল ভেঙে যবিপ্রবির খেলোয়াড়দের মারতে উদ্যত হন। এ সময় যবিপ্রবির শিক্ষার্থী মারুফ তাকে বাধা দিতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। একই সঙ্গে মারুফের গলায় থাকা রুপার চেইন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে যবিপ্রবির শরীর চর্চা শিক্ষা দপ্তরের সহকারী পরিচালক উজ্জ্বল চন্দ্র সূত্রধর বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। গতকাল রাতে অনুষ্ঠিত সভায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করে খেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হলে আমরা ফাইনাল খেলতে সম্মতি জানাই। কিন্তু খেলা শুরুর পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড় ও শিক্ষার্থীরা আমাদের খেলোয়াড়দের গালিগালাজ করেন। বিষয়টি রেফারিকে জানাতে গেলে আমাদের খেলোয়াড় ছোয়াকে হলুদ ও লাল কার্ড দেখানো হয়। পরে ম্যাচ কমিশনারের কাছে প্রতিবাদ জানালে লাল কার্ড প্রত্যাহার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয়ার্ধে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আমাদের খেলোয়াড়কে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর প্রতিবাদ জানাতে গেলে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা মারধর শুরু করেন। মাঠের বাইরেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। এমনকি এক নারী শিক্ষার্থী গাছের ডাল নিয়ে আমাদের খেলোয়াড়দের মারতে উদ্যত হন। আমরা খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়তে বাধ্য হই।
যবিপ্রবির টিম ম্যানেজার ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আয়োজকদের আশ্বাসে আমরা মাঠে নেমেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের খেলোয়ারদের বিভিন্নভাবে হেনস্থা ও মারধর করতে উদ্যত হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো আন্তরিকতা ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ নেই, তাই আমাদের পক্ষ থেকে আর খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আমাদের অনেক খেলোয়াড় আহত হয়েছে আমরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করেছি।
প্রতিপক্ষ দলের ফুটবলারদের মারধরের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা দপ্তরের পরিচালক ও আয়োজক কমিটির দায়িত্বে মোহাম্মদ শফিউল করিম বলেন, যখন খেলোয়াড় নিয়ে আপত্তি তোলা হয় তখন আমি নিজে আইসিটি ভবনে গিয়ে অনলাইনে ছবি ও আইডি চেক করেছি। সেখানে কোনো গরমিল পাওয়া যায়নি। মাঠে ঝামেলার পর খেলা সম্পন্ন করতে দুই ঘণ্টা বৈঠক করে পুনরায় খেলা চালু ও নতুন প্লেয়ার নামানোর প্রস্তাব দিলেও যবিপ্রবি টিম আর না খেলার সিদ্ধান্ত জানায়। ম্যাচের রেজাল্ট দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের দপ্তরের নেই। এটি সম্পূর্ণ রেফারি, টিম ম্যানেজার ও ফেডারেশন সেক্রেটারির দায়িত্ব।
বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া বোর্ডের সেক্রেটারি মাহবুবুল আলম বলেন, খেলার যে রেজাল্ট দেওয়া হয়েছে, এটা দিয়েছে ম্যাচ কমিশনার। ম্যাচ শেষে কমিশনারের রিপোর্টের ভিত্তিতে এখানে রেজাল্ট হয়েছে। আর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছে আজকের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত। এই সুষ্ঠু তদন্ত করার কাজ আমাদের আয়োজক কমিটির না। তদন্ত কমিটি গঠন করবে আন্তবিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস বোর্ড।
