বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব চিংড়িচাষি দেলোয়ার তরফদার। চলতি বছর জমানো টাকা ও ঋণ নিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু বছরের শুরুতেই ঘেরে মড়ক লাগায় বাগদা চিংড়ি মরতে শুরু করে। পরে ঋণ নিয়ে আবারও বাগদার পোনা ছাড়েন তিনি। বড় হওয়ার আগে ভাইরাসের সংক্রমণে সেগুলোও মারা যায়।
বড় ধাক্কা সামলে গলদা চিংড়ি চাষের প্রস্তুতি নিলেও এবার সংকট রেণু সংগ্রহ নিয়ে। চাহিদামতো রেণু না পেয়ে কয়েক দফায় বেশি দামে কিনতে বাধ্য হয়েছেন। সময়মতো রেণু ছাড়তে না পারায় ফের লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। গত বুধবার বিকেলে ঘেরে বসে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
দেলোয়ার তরফদার বলেন, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে চিংড়ি চাষ করছি। এবার দফায় দফায় বাগদা চিংড়ি মারা গেছে। ফলে খরচের টাকাই ওঠেনি। অপরদিকে তার ১০০ বিঘার বেশি আয়তনের ঘেরে দেড় লাখ গলদার রেণু প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পাঁচ-সাতবার আড়তে গিয়েও একসঙ্গে প্রয়োজনীয় রেণু পাননি। প্রতিবার বেশি দামে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার করে রেণু কিনতে হয়েছে।
একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী কাড়াপাড়া গ্রামের চিংড়িচাষি শামীম হাসানের। বছরের শুরুতে বাগদার পোনা ছাড়লেও ধরার উপযোগী হওয়ার আগেই সেগুলো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এপ্রিল থেকে জুন গলদার রেণু ছাড়ার মৌসুম। তবে মৌসুম শেষ হতে চললেও চাহিদামতো রেণু সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি। কয়েক বার আড়তে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে খালি হাতে। বাগদার ক্ষতি ও রেণুর সংকটে লোকসানের আশঙ্কা করছেন এই চাষিও।
ডেমা এলাকার চিংড়িচাষি সবুজ তরফদার বলেন, এ বছর ৪৫ হাজার রেণু ছাড়লেও একসঙ্গে পাইনি। আড়তে সংকট থাকায় প্রতিবার ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার করে কিনতে হয়েছে। রেণুর দাম বেশি হওয়ায় এবং বারবার যাতায়াত করতে হওয়ায় খরচ বেড়েছে।
বিভিন্ন এলাকার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাগেরহাটে সরকারি ও বেসরকারি গলদা হ্যাচারির বেশ কয়েকটি বন্ধ থাকায় রেণুর সরবরাহ কমেছে। একদিকে মানসম্মত রেণুর সংকট, অন্যদিকে বেড়েছে দাম। সংকট নিরসনে বন্ধ হ্যাচারিগুলো চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাট জেলায় ৫৪ হাজার ৮৪৮টি গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। এসব ঘেরে বছরে ৫৮ কোটি ৬০ লাখ রেণুর চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে হ্যাচারিগুলোতে উৎপাদিত রেণু দিয়ে মোট চাহিদার মাত্র ৪ শতাংশ পূরণ হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কের পাশে ফুলবাড়ী এলাকার ব্র্যাক হ্যাচারিটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ঝোপঝাড় ও আগাছায় ছেয়ে গেছে এর চারপাশ। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা অবকাঠামোর যন্ত্রাংশও নষ্ট হচ্ছে।
একই অবস্থা বাগেরহাট প্রণ হ্যাচারি ও মোরেলগঞ্জের রূপা গলদা হ্যাচারির। একসময় রেণু উৎপাদন ও সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হ্যাচারিগুলো এখন বন্ধ।
চিংড়িচাষি হুমায়ুন শেখ বলেন, এ বছর চাহিদা অনুযায়ী রেণু ছাড়তে পারিনি। রেণুসংকট থাকায় দামও অনেক বেশি। পর্যাপ্ত রেণু ছাড়তে না পারায় বছর শেষে লাভ তেমন হবে না। আমাদের এই হ্যাচারিগুলো অনেক দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আমাদের অনেক দূর থেকে রেণু আনতে হয়। এতে অনেক পরিবহন ব্যয় বাড়ে। যদি বন্ধ হ্যাচারিগুলো চালু হয় তাহলে আমরা চাষিরা এই জায়গা থেকেই পোনা নিতে পারব।
ফকিরহাট উপজেলার মৌভূক এলাকার মৎস্যচাষি দীপক চৌধুরী বলেন, আগে রেণুর দাম ছিল ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। এ বছর রেণুর দাম ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা। এই দামেও পর্যাপ্ত রেণুও পাওয়া যায়নি আড়তে। আমার ১০ বিঘা ঘেরে মাত্র ৪ হাজার রেণু ছাড়তে পারছি। রেণু না পাওয়ায় এ বছর লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হবে।
ফকিরহাটের রেণুর আড়তদার সালাম শেখ বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভর করে। আমাদের ফকিরহাটের ৬০টির মতো রেণুর আড়ত রয়েছে। এ বছর চিংড়িচাষিরা রেণু নিতে এসে ফিরে গেছেন। তাদের চাহিদা অনুযায়ী রেণু দিতে পারিনি। এতে চিংড়িচাষি ও আমরা আড়তদাররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এ বছর হ্যাচারি থেকে যে রেণু পেয়েছি তা চাহিদার মাত্র ৮ থেকে ১০ ভাগ। বাকি চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী জেলার নদী ও সমুদ্র থেকে আহরিত রেণু ও ভারত থেকে আসা রেণুর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু সরকার নদী ও সমুদ্র থেকে আহরিত রেণু এবং ভারতীয় রেণু ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করায় রেণুসংকট সৃষ্টি হয়েছে।
বাগেরহাট চিংড়িচাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, সরকারি হিসাবে গলদা রেণুর চাহিদা প্রায় ৬০ কোটি। তবে বাস্তবে চাহিদা আরও বেশি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ খুবই কম। সরকারি-বেসরকারি হ্যাচারি মিলিয়ে বছরে দুই থেকে আড়াই কোটি রেণু পাওয়া যায়। বন্ধ বেসরকারি হ্যাচারিগুলো চালু করে রেণু উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সংকট কিছুটা কমবে।
একটি বন্ধ হ্যাচারি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা রহিম গাজী বলেন, প্রথম দফায় উৎপাদনে লোকসান হয়। পরে বিরতি দিয়ে আবার উৎপাদন শুরু করলেও লোকসান হয়। এরপর থেকে হ্যাচারিটি বন্ধ রয়েছে।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় গলদা চিংড়ির ৯টি হ্যাচারির মধ্যে ৫টি চালু এবং ৪টি বন্ধ। জেলায় ৫৮ কোটি রেণুর চাহিদা রয়েছে। বন্ধ হ্যাচারিগুলো চালু থাকলে চাহিদার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হতো। হ্যাচারিগুলোর লাইসেন্স নবায়ন করে কার্যক্রম শুরুর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে সাড়া না পাওয়ায় লাইসেন্স বাতিলের জন্য চূড়ান্ত পত্র পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার নদী থেকে রেণু আহরণ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ করায় আমরা কঠোরভাবে নজরদারি করেছি। অবৈধভাবে বাইরের দেশ থেকে যদি বাংলাদেশে কোনো রেণু আসে তাহলে গলদা চিংড়ি চাষে নতুন রোগের সম্ভাবনা থাকতে পারে। চাষিদের চাহিদা মেটাতে খুলনাতে কয়েকটি হ্যাচারি স্থাপনের কাজ চলছে। এই হ্যাচারিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও অনেক। হ্যাচারিগুলো উৎপাদন লক্ষ্য পূরণ করলে রেণুর আর সংকট হবে না।
