সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে উমরা পালনে ইচ্ছুকদের ভ্রমণ চাহিদায় বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরে একের পর এক হামলার ঘটনায় একাধিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় উমরা পালকারীরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ফলে অনেকেই তাদের পূর্বনির্ধারিত উমরা যাত্রা স্থগিত করছেন কিংবা বিকল্প পথের সন্ধান করছেন।
সাধারণত অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত উমরা পালনের ব্যস্ত মৌসুম থাকলেও এবারের অচলাবস্থা ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর ব্যবসাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমিরাতের স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বরাতে জানা গেছে, রিয়াদ বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবর সামনে আসার পর থেকেই উমরা সংক্রান্ত অনুসন্ধান এবং নতুন বুকিংয়ের সংখ্যা অভাবনীয় হারে কমে গেছে।
পিলগ্রিমেজ এন্ড আদার হোলি প্যাকেজেস নামক ভ্রমণ সংস্থায় কর্মরত আমিরাত প্রবাসী আফসাল কেএইচ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলোর পর থেকেই মানুষের ট্রাভেল এনকোয়ারি অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। যাত্রীরা উমরা করতে গিয়ে সৌদি আরবে আটকে পড়া বা ফ্লাইট বাতিলের বিষয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হয়েছে। এতে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাভাবিক উড়োজাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এই বিমানবন্দর বন্ধের মেয়াদ ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। রিয়াদের মূল আকাশপথটি অচল হয়ে পড়ায় এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। এতে রিয়াদ হয়ে যাতায়াতকারী যাত্রী এবং মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসা ও উমরাযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উমরা যাত্রীদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ট্রাভেল গ্রুপ লিডার আফসাল কেএইচ জানান, তিনি সম্প্রতি ১০ সদস্যের একটি উমরা দলের নেতৃত্ব দিয়ে মদিনায় অবস্থান করছিলেন। মদিনা থেকে রিয়াদ হয়ে দুবাই ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু রিয়াদে হামলা শুরু হলে তাদের ফিরতি ফ্লাইটটি বাতিল হয়। ফলে তাদের মদিনায় বাড়তি একদিন অবস্থান করতে হয়। প্রথম দিকে ভোরবেলার বিকল্প ফ্লাইটের সন্ধান করা হলেও কোনো সিট মেলেনি, অথবা অন্যান্য ফ্লাইটও বাতিল করা হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা সড়কপথে বাহরাইন সীমান্ত হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আমিরাতে ফিরে আসেন।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে যাত্রীদের যাতায়াত খরচও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আফসাল জানান, অন-দ্য-স্পট রিফান্ডেবল নতুন ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি হচ্ছিল প্রায় ২৫০০ দিরহামের বেশি দামে। অন্যদিকে মদিনা থেকে সড়কপথে যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থার খরচ ছিল ১০০ থেকে ৬০০ দিরহাম পর্যন্ত। কিন্তু দীর্ঘ সড়কযাত্রায় পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। এমন অনিশ্চয়তার কারণে তাদের সবাইকে অতিরিক্ত ছুটির আবেদন করতে হয়েছে এবং মানসিক উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
আরুহা ট্রাভেলস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রশিদ আব্বাস জানান, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে উমরা ভ্রমণের মূল মৌসুম শুরু হলেও এবার রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধের প্রভাবে উমরা পালনেচ্ছুকরা বাধ্য হয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত করছেন। জরুরি প্রয়োজনে কিছু ব্যবসায়িক বা অফিসিয়াল ভ্রমণ চালু থাকলেও উমরা বুকিং একদম তলানিতে ঠেকেছে। যেসব যাত্রীদের আগের বুকিং ছিল, তারা নতুন তারিখে টিকিট পেছাচ্ছেন অথবা এয়ারলাইনগুলোর দেওয়া বিনামূল্যে তারিখ পরিবর্তন ও ফুল রিফান্ডের সুযোগ নিচ্ছেন।
ট্রাভেল এজেন্টরা জানান, যারা ইতোমধ্যে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তারা দাম্মাম বিমানবন্দর অথবা মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। এছাড়া ফ্ল্যাইদুবাই, ফ্লাইনাস এবং এয়ার অ্যারাবিয়ার মতো বিমানসংস্থাগুলো মদিনা ও দুবাইয়ের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট সচল রেখেছে, যা অনেক যাত্রীকে স্বস্তি দিচ্ছে।
স্মার্ট ট্রাভেলসের চেয়ারম্যান আফি আহমেদ বলেছেন, বিমানের টিকিট বা ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা এড়াতে অনেকেই এখন বাসে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন। মানুষের মধ্যে ভ্রমণ আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং ঘটনাটির কারণে দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা ক্ষতি হলো। তবে বাস সার্ভিস চালু থাকায় অনেক উমরাযাত্রী আকাশপথের ওপর নির্ভর না করে বাসে ট্রানজিট নিচ্ছেন। নতুন যারা উমরা যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন, তারা সবাই রিয়াদ বিমানবন্দরের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।
তবে সৌদির সব বিমানবন্দরে এই প্রভাব সমানভাবে পড়েনি। দেরা ট্রাভেলস-এর জেনারেল ম্যানেজার টিপি সুধীশ জানিয়েছেন, জেদ্দাকেন্দ্রিক ফ্লাইট পরিচালনা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। এমিরেটস, সৌদিয়াসহ অন্যান্য প্রধান এয়ারলাইনস জেদ্দায় স্বাভাবিক সূচি অনুযায়ী ফ্লাইট চালাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীরা তাদের টিকিট পরিবর্তনের সুবিধা পাচ্ছেন অথবা পুরো রিফান্ড নিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্লাইনাস এবং ফ্লাইডিলের মতো বাজেট এয়ারলাইন্সগুলো কিছুটা সহায়তা করছে। তবে দীর্ঘ বাসযাত্রার চেয়ে মানুষ ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছে। সামগ্রিকভাবে, রিয়াদ বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত উমরাযাত্রীরা নতুন কোনো উমরা পরিকল্পনা করতে দ্বিধাবোধ করছেন।
