বয়সের ভিত্তিতে কাউকে বিচার, তার সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ কিংবা বয়সের কারণে তাকে কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত করাকে বলা হয় ‘এজিজম’ বা বয়সভিত্তিক বৈষম্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, এ ধরনের বৈষম্য অন্যদের প্রতি আমাদের আচরণকেই শুধু প্রভাবিত করে না, নিজেদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিতে পারে
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে বাসা বাঁধে নানা দুশ্চিন্তা। আগের মতো শরীর চলবে তো? নতুন কিছু শেখা কি আর সম্ভব? বয়সের কারণে সুযোগ কমে যাবে না তো?
সমাজেও অনেক সময় বয়স্ক মানুষদের দুর্বল, অসুস্থ কিংবা কর্মক্ষমতাহীন হিসেবে দেখা হয়। অথচ বয়স বাড়লেই যে মানুষের সক্ষমতা কমে যাবে, এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব মানুষের জীবনযাপনে ভালো প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি যারা বয়স বৃদ্ধিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন, তাদের গড় আয়ু অন্যদের তুলনায় বেশি হওয়ার প্রমাণও পেয়েছেন গবেষকরা। অন্যদিকে, বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা মানুষের আত্মবিশ্বাস কমাতে পারে, নতুন কিছু শেখার আগ্রহে বাধা দিতে পারে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়সের ভিত্তিতে কাউকে বিচার, তার সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ কিংবা বয়সের কারণে তাকে কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত করাকে বলা হয় ‘এজিজম’ বা বয়সভিত্তিক বৈষম্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, এ ধরনের বৈষম্য অন্যদের প্রতি আমাদের আচরণকেই শুধু প্রভাবিত করে না, নিজেদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিতে পারে।
বয়সভিত্তিক বৈষম্য যেকোনো বয়সের মানুষের সঙ্গেই ঘটতে পারে। যেমন জেন-জি প্রজন্মের মানুষদের অনেক সময় অলস বলে চিহ্নিত করা হয়। তবে এ ধরনের বৈষম্যের শিকার বেশি হন বয়স্ক ব্যক্তিরা। যুক্তরাজ্যে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটির প্রতি তিনজনের একজন বয়সের কারণে কোনো না কোনো ধরনের পক্ষপাত বা বৈষম্যের মুখোমুখি হন। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০-৮০ বছর বয়সী দুই হাজার মানুষের ওপর করা এক গবেষণায় ৯৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তারা দৈনন্দিন জীবনে বয়সভিত্তিক বৈষম্যের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন।
বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয় কীভাবে?
বয়স বৃদ্ধি সম্পর্কে আমাদের অনেক ধারণাই ছোটবেলা থেকে তৈরি হয়। পরিবার, গণমাধ্যম কিংবা আশপাশের মানুষের কথাবার্তা থেকে শিশুরা শিখতে পারে যে বয়স্ক মানুষ দুর্বল, নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা তাদের কম কিংবা নির্দিষ্ট বয়সের পর কিছু কাজ আর করা উচিত নয়। কোনো কোনো গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছর বয়সের শিশুর মধ্যেও বয়স নিয়ে পক্ষপাতমূলক ধারণা তৈরি হতে পারে।
সমস্যা হলো, এসব ধারণা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনারও অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফলে একসময় আমরাও বিশ্বাস করতে শুরু করি, বয়স বেড়ে গেলে নতুন কিছু শেখা, কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়া কিংবা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কমে আসে।
নেতিবাচক ধারণা যেভাবে নিজের ওপর প্রভাব ফেলে
বয়স নিয়ে সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা একসময় ব্যক্তির নিজের বিশ্বাসে পরিণত হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় ‘স্টেরিওটাইপ এমবডিমেন্ট থিওরি’। অর্থাৎ, সমাজের প্রচলিত ধারণা মানুষ অজান্তেই নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং পরে সেই ধারণা তার আচরণ ও স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
ধরা যাক, একজন বয়স্ক ব্যক্তি মনে করেন, এই বয়সে নতুন কোনো প্রযুক্তি শেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে শেখার সুযোগ পেলেও তিনি হয়তো আগ্রহ দেখাবেন না। এতে তার আত্মবিশ্বাস কমতে পারে এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও হাতছাড়া হতে পারে।
এভাবে নেতিবাচক ধারণা অনেক সময় নিজের কাছে সত্য বলে মনে হতে থাকে। বয়সের কারণে কোনো কাজ পারবেন না—এমন বিশ্বাস থেকে মানুষ কাজটি করার চেষ্টা বন্ধ করে দেন। পরে সেই কাজের অভিজ্ঞতা না থাকাকেই নিজের অক্ষমতার প্রমাণ বলে মনে করতে পারেন।
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কি আয়ু বাড়াতে পারে?
বয়স বাড়াকে ইতিবাচকভাবে দেখার সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক বেকা লেভি বয়স নিয়ে মানুষের বিশ্বাস এবং স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ব্যক্তিরা নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীদের তুলনায় গড়ে সাড়ে সাত বছর বেশি বেঁচেছেন। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশের গবেষণায়ও এ ফলাফলের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক চিন্তা করলেই আয়ু সাড়ে সাত বছর বেড়ে যাবে। বরং গবেষণাটি বয়স নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দীর্ঘায়ুর একটি সম্পর্ক তুলে ধরে।
লেভির গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা থাকা ব্যক্তিদের স্মৃতিশক্তির কার্যকারিতাও তুলনামূলক ভালো হতে পারে। তাদের মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জৈবিক সূচকের মাত্রা কম থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ হিপোক্যাম্পাসের সংকোচনও তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
অন্যদিকে, বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, চিন্তাভাবনা ও স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যার পাশাপাশি উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এসব ধারণার কারণে কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দিতে পারেন। ফলে একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
পোশাক থেকে কাজ—বয়সের নামে বাধা কেন?
বয়সভিত্তিক বৈষম্য শুধু স্বাস্থ্য কিংবা কর্মক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের পোশাক, জীবনযাপন এবং সামাজিক পরিসরে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দেখা যায়।
কোন বয়সে কেমন পোশাক পরা উচিত, কোন বয়সের মানুষের কোথায় যাওয়া মানানসই—এসব নিয়ে সমাজে নানা অলিখিত নিয়ম রয়েছে। কোনো বয়স্ক ব্যক্তি এসব নিয়মের বাইরে গেলে তাকে নিয়ে কটূক্তি করা হতে পারে। যেমন, বেশি বয়সে বিনোদন কিংবা তরুণদের মতো পোশাক পরার কারণে কেউ সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন।
সুইফটের মতে, সমাজে বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছে কী প্রত্যাশা করা হয়, তা নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলানো প্রয়োজন। বয়সের ভিত্তিতে মানুষের জন্য নির্দিষ্ট আচরণ, পোশাক কিংবা জীবনযাপনের সীমা নির্ধারণ করলে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়।
গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনেও বয়স্ক মানুষদের আরো বৈচিত্র্যময়ভাবে তুলে ধরা জরুরি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এজিজম ইজ নেভার ইন স্টাইল’-এর প্রতিষ্ঠাতা জেসিন্থ বাসেট বলেন, ৫০ বছরের বেশি বয়সী সবাইকে একই ধরনের মানুষ হিসেবে দেখার প্রবণতা বদলাতে হবে। শুধু পাকা চুলের একজন মডেলকে বিজ্ঞাপনে রাখলেই বয়স্ক মানুষের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। বরং বিভিন্ন বয়সের মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা ও পরিচয়ের বৈচিত্র্য তুলে ধরা প্রয়োজন।
বয়স বাড়াকে সম্মানের চোখে দেখা
বয়স বাড়া নিয়ে সব সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। বিশ্বের অনেক সংস্কৃতিতে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানোর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
জাপানে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সোমবার পালিত হয় ‘কেইরো নো হি’ বা প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। ১৯৬৬ সালে দিবসটি দেশটির সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এ ছাড়া জাপানে ৬০, ৭৭, ৮৮ ও ৯৯ বছর বয়স পূর্ণ হওয়াও বিশেষভাবে উদ্যাপন করার রীতি রয়েছে।
অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বয়স্ক ব্যক্তিরা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাদের অনেক সময় জ্ঞানের ভান্ডার কিংবা জীবন্ত গ্রন্থাগার হিসেবে দেখা হয়।
বয়সভিত্তিক বৈষম্য কাটিয়ে উঠবেন যেভাবে
বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা বদলাতে হলে সামাজিক ও ব্যক্তিগত—দুই পর্যায়েই উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন বয়সের মানুষের যোগাযোগ বাড়ানো এর একটি উপায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও যৌথ কর্মকাণ্ড বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে। যখন তরুণ ও বয়স্ক মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন কিংবা পরস্পরের কাছ থেকে শেখেন, তখন একে অপরকে নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙার সুযোগ তৈরি হয়।
পরিবারের বয়স্ক সদস্যদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বয়স বাড়ার সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে নেয়া কোনো ব্যক্তিকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে দেখেছেন, তাদের মধ্যে বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তুলনামূলক কম ছিল। অনেকেই এ ক্ষেত্রে নিজের মা-বাবা, দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বয়স নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা যাচাই করাও জরুরি। এ বিষয়ে বেকা লেভি ‘ব্রেকিং দ্য এইজ কোড’ বইয়ে ইতিবাচক ধারণা গড়ে তোলার জন্য ‘এবিসি পদ্ধতি’র কথা বলেছেন।
প্রথমত, নিজের ধারণা সম্পর্কে সচেতন হোন। বয়স নিয়ে নিজের মনে কী ধরনের বিশ্বাস কাজ করে, তা খেয়াল করুন। এক সপ্তাহ ধরে কোথায়, কখন এবং কীভাবে বয়স সম্পর্কে নেতিবাচক বা ইতিবাচক কথা শুনছেন, তা লিখে রাখতে পারেন। এতে নিজের অজান্তে গড়ে ওঠা ধারণাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, সমস্যার জন্য বয়সকে দায়ী করছেন কিনা, ভাবুন। কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া কিংবা নতুন কিছু করতে না পারার কারণ বয়স, নাকি বয়স নিয়ে অন্যের পক্ষপাত—সেটি বোঝার চেষ্টা করুন।
তৃতীয়ত, প্রচলিত ধারণার সত্যতা যাচাই করুন। বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি বা শেখার ক্ষমতা কমবেই—এমন ধারণা প্রশ্নের মুখে ফেলুন। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন দক্ষতা শেখার মতো কাজে নিয়মিত যুক্ত থাকা বয়স্ক ব্যক্তিদের স্মৃতিশক্তির কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
আপনার বয়স কত, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বয়সকে আপনি কীভাবে দেখছেন। কারণ বয়স বাড়া জীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ। এর সঙ্গে শারীরিক পরিবর্তন আসতে পারে, কারো কারো স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জও দেখা দিতে পারে। কিন্তু বয়সের কারণে মানুষের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না।
বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমানো মানে শুধু বয়স্ক মানুষের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ নিশ্চিত করা নয়। বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে বয়স যা-ই হোক, প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শেখার, কাজ করার এবং অর্থপূর্ণ জীবন যাপনের সুযোগ পান।
বিবিসি থেকে নেয়া
