দুর্গাপূজার আনন্দের মধ্যে শনিবার (১৭ অক্টোবর) মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এল কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপে। প্রবল ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে সরকারিভাবে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বেসরকারি মতে এই সংখ্যা ১৮। এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে এবং আশ্রয় নিতে দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। মণ্ডপের প্রবেশপথ সরু হওয়ায় ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মুহূর্তের মধ্যে সেখানে তীব্র জটলা তৈরি হয়। এর ওপর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আর তাতেই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। আকস্মিক বিশৃঙ্খলায় বেশ কয়েকজন ভিড়ের মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়েন ও পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা এই পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনিক অব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, মণ্ডপের আশেপাশে পর্যাপ্ত পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা ছিল না। মাইকের ভুল ঘোষণায় পরিস্থিতি আরো বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে, ভিড় সামলানোর মতো কাউকে দেখা যায়নি। এবছর ৯১তম বছরে পড়েছে চোরবাগান সর্বজনীন পূজা। ফলে পূজার প্রথম দিন থেকেই সেখানে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে।
দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহত ২৫ জনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় পরবর্তীতে ১১ জন আহতকে স্থানান্তরিত করা হয় এসএসকেএম হাসপাতালে।
মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে ৩ জন পুরুষ, ১ জন শিশু এবং ১৩ জন নারী রয়েছেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি জরুরি টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।
খবর পেয়ে রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জী এবং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর মুখ্যমন্ত্রী এক বিবৃতিতে ১৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করে পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।
বন্ধ রাখা হয়েছে একাধিক পূজামণ্ডপ
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে চেতলা অগ্রণী, অ্যালেন পার্ক, টালা প্রত্যয়সহ কলকাতার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপও শনিবার রাতে কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয় এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে কড়া ব্যবস্থা নেয় রাজ্য প্রশাসন।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শোক ও সফর বাতিল
ঘটনার দিন রাতেই দুই দিনের সফরে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তবে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জেরে তিনি রবিবারের তার সব নির্ধারিত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাতিল করেছেন। এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে তিনি জানান, হাসপাতালে আহতদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছেন এবং পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন।
এই গভীর ট্র্যাজেডিতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে আহতদের সব ধরনের চিকিৎসার ও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে বদল হওয়ায় গোটা রাজ্যজুড়ে নেমেছে শোকের ছায়া।
