ড. মোস্তাফিজুর রহমান
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ‘টিকফা’ প্ল্যাটফর্মটি এ ধরনের আলোচনার জন্য একটি ভালো সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। উদ্ভূত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের উচিত এই প্ল্যাটফর্মটিকে কাজে লাগানো এবং নিজেদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করা।...
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) প্রধান উৎস এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রাখাই হবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং প্রায় অন্য সব দেশের আমদানির ওপর যে পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিল, তা যেকোনো বিচারেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন চুক্তিতে নিহিত নিয়মভিত্তিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার একটি চরম লঙ্ঘন ছিল।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলো কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য আলাদা বা বিশেষ শুল্ক আরোপ করতে পারে না; বরং একই পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে সব দেশের জন্য শুল্কের হার অভিন্ন হতে হবে। (এটি WTO-এর ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ বা MFN নীতি–অর্থাৎ ‘একজনের প্রতি বিশেষ সুবিধা মানেই সবার প্রতি সুবিধা’র নীতি)। বস্তুত, এই পারস্পরিক শুল্কে বা RT-এর যৌক্তিকতা নিয়ে নানা দিক থেকে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।
প্রথমত, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান MFN আমদানি শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবেই মার্কিন প্রশাসন এই পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিল, যা WTO-এর MFN নীতির পরিপন্থি।
দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক শুল্কে হিসাব করার পদ্ধতিটি এমন ছিল যে, একই আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের জন্য অতিরিক্ত শুল্কের হার ভিন্ন হতো; এটিও ছিল WTO-এর ‘একজনের প্রতি সুবিধা মানেই সবার প্রতি সুবিধা’ নীতির লঙ্ঘন।
তৃতীয়ত, RT হিসাব করার জন্য যে সূত্রটি ব্যবহার করা হয়েছিল (যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি থেকে রপ্তানি বিয়োগ করে তাকে আমদানি দিয়ে ভাগ করে শতকরা হারে প্রকাশ করা)–তা কোনো যুক্তি বা অর্থনৈতিক বিচার-বিশ্লেষণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
চতুর্থত, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যঘাটতি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর–এই ধারণাটি কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব কিংবা বাস্তব তথ্য-প্রমাণ কোনোটির দ্বারাই সমর্থিত নয়।
এর বিপরীতে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য ও বাণিজ্য উদারীকরণের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিল এবং ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল (এর আগে GATT-এর আলোচনাতেও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী ছিল)।
এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে যে, বাণিজ্য কেবল উদ্বৃত্ত বা ঘাটতির বিষয় নয়, বরং এর বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বাণিজ্য উদারীকরণের নীতি অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৫ সালে জাপানের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু আয় ৫০ শতাংশ কম ছিল; অথচ ২০২৫ সালে তা জাপানের তুলনায় প্রায় ১৫০ শতাংশ বেশি পর্যায়ে উন্নীত হয়।
পঞ্চমত, শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসন কেবল পণ্য বাণিজ্যের বিষয়টিই বিবেচনায় নিয়েছিল। কিন্তু সেবা খাতের বাণিজ্যের বিষয়টি উপেক্ষা করেছিল–যেখানে অনেক দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। বস্তুত, সেবা বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত ২০০০ সালের ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমসে বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যগুলোর ওপর গড় আমদানি-ভারযুক্ত শুল্ক এখন দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ শতাংশে। এর বিপরীতে, বাংলাদেশের কাস্টমসে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক বর্তমানের ৬.২ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা হবে। বস্তুত, বাংলাদেশের আমদানিকারকদের প্রাপ্ত কর ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বাংলাদেশের গড় আমদানি শুল্কের হার বর্তমানে প্রায় ২.২ শতাংশ।
ART-এর ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশকে কী করতে হবে, সে বিষয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির পরিভাষায় বাধ্যতামূলক নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত ‘Bangladesh shall’ (বাংলাদেশকে অবশ্যই করতে হবে) শব্দগুচ্ছটি ART-এর ৩২ পৃষ্ঠার মূল নথিতে ১৩১ বার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ‘US shall’ (যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই করতে হবে) কথাটি মাত্র ৬ বার ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে, ‘may’ (করতে পারে/অনুমতি থাকতে পারে) শব্দটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৫ বার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশ আগামী ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত ৭,১৩২টি ট্যারিফ লাইনের (পণ্যের শ্রেণিবিভাগ) পণ্যের ক্ষেত্রে MFN-এর আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ৪,৯২২টি পণ্য ART কার্যকর হওয়ার পরপরই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এবং অবশিষ্ট ২,২১০টি পণ্য ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এই সুবিধা পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলা এবং কৃত্রিম তন্তু (MMF) দিয়ে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে ‘রুলস অফ অরিজিন’ বা উৎপত্তিস্থল-সংক্রান্ত শর্ত (RT) ছাড়াই প্রবেশের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও MMF দিয়ে তৈরি পোশাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস পয়েন্টে প্রযোজ্য MFN শুল্ক (বর্তমানে পোশাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গড় আমদানি-ভারিত শুল্কের হার প্রায় ১৬ শতাংশ) যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত হতে থাকবে।
যদিও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় সব পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা প্রদান করবে, তবুও এআরটি-তে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরটি কমানোর বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।
এর ফলে, কার্যত দুই দেশের মধ্যকার শুল্কের পার্থক্য আরটি আরোপের আগের তুলনায় অনেক বেশিই থেকে যাবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কের পার্থক্য আরটি-পূর্ববর্তী সময়ে ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং এআরটির পূর্ণ বাস্তবায়ন পর্যায়ে তা প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছাবে।
এআরটি বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ওপর মার্কিন কাস্টমসে আদায়কৃত শুল্কের পরিমাণ ১.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আদায়কৃত শুল্কের পরিমাণ প্রায় ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে কমে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসব পণ্য আমদানির বার্ষিক মূল্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কম হয়ে থাকে। এই ধারায় এলপিজি আমদানি এবং ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ART-এ আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়াতে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত রাখতে প্রচেষ্টা চালাবে।’
শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে যেখানে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ যদি এআরটির বিধানগুলো ‘মেনে না চলে’, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘রেফারেন্স ট্যারিফ’ বা আরটি বাড়িয়ে দিতে পারে। আর এই ‘বিধান মেনে চলা’ বা ‘কমপ্লায়েন্স’-এর সংজ্ঞাটি অত্যন্ত ব্যাপক। চুক্তিতে এমন কিছু বিধান রয়েছে যা বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সব নীতির সঙ্গে আবদ্ধ করে, যা কেবল বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমরা জানি যে, বাংলাদেশ রাশিয়ার সহায়তায় তার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে। ভবিষ্যতে কেন্দ্রটির সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশ হয়তো আবারও রাশিয়ার কাছ থেকেই চুল্লি কেনার কথা বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু ‘এআরটি’র আওতায় এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে এআরটির ৪.৩ অনুচ্ছেদের ভাষা বেশ কঠোর এবং তা এ ধরনের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
এই চুক্তিতে এমন কিছু বিধান রয়েছে যা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ–মেধা সম্পদ অধিকার কার্যকর করা, শ্রম অধিকার ও SPS-TBT মানদণ্ড মেনে চলা, পরিবেশগত শর্তাবলি পূরণ, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর ইত্যাদি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের জন্য নিজ উদ্যোগেই এসব শর্ত মেনে চলা ও বাস্তবায়ন করা হবে একটি বিচক্ষণ পদক্ষেপ। উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি, কারণ এটি খোদ বাংলাদেশেরই স্বার্থের অনুকূল।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ‘টিকফা’ প্ল্যাটফর্মটি এ ধরনের আলোচনার জন্য একটি ভালো সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। উদ্ভূত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের উচিত এই প্ল্যাটফর্মটিকে কাজে লাগানো এবং নিজেদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করা।
লেখক: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো
