প্রথমে অস্ত্রের মুখে জিম্মি, এরপর পোশাক খুলে ভিডিও ধারণ। সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, আবার কখনও ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন। টাকা দিতে না চাইলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে সন্দ্বীপ থেকে আসা কিশোর-তরুণদের নিয়ে এমনই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ‘কর্মী’ আখ্যা দিয়ে তুলে নিয়ে একটি চক্র তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা এসব ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে সামনে এসেছে স্থানীয় যুবদল নেতা নুর হোসাইন নুরু, মোয়াজ্জেম ও তাদের সহযোগীদের নাম। নুরু জিয়া সাইবার ফোর্স চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সহ-সভাপতিও। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, শতাধিক কিশোর-তরুণের প্রায় সবাইকে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। তাদের কেউ দিয়েছেন মুক্তিপণ, কেউ হয়েছেন ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের শিকার, আবার কেউ লোকলজ্জার ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।

ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই সন্দ্বীপের বাসিন্দা। তারা পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকায় বসবাস করেন। বয়স ১৭ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় তাদের ছাত্রলীগের কর্মী আখ্যা দিয়ে তুলে নেওয়া হয়। এরপর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আটকে রাখা, মারধর, যৌন নিপীড়ন এবং ভিডিও ধারণের ঘটনা ঘটে। ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তাকে আবার ডেকে নেওয়া কিংবা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের বক্তব্য, ঘটনার পর তারা সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কায় মুখ খুলতে চাননি। কেউ কেউ পরিবারের নিরাপত্তা ও সম্মানের কথা ভেবে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের ভাষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের চলাফেরার ওপর নজর রাখতেন এবং মাঝেমধ্যে ফোন করে দেখা করতে বলতেন। না গেলে যৌন নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো।

‘তোরে মাঝেমধ্যে একটু দরকার হয়’
এক ভুক্তভোগীর কাছে পাঠানো একটি অডিওতে নুর হোসাইন নুরুকে বলতে শোনা যায়, ‘থাকিস কডে তুই। তোরে দেখাটেখা যায় না। তোরে মাঝেমধ্যে একটু দরকার হয়। তার মধ্যে ইয়া তোরে দেখাইলাম না।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ ধরনের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। তাদের কাউকে কাউকে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে দেখা করতে বলা হতো। দেখা না করলে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। চট্টগ্রাম প্রতিদিন ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, অডিও এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য যাচাই করেছে।
এক ভুক্তভোগী জানান, তাকে ও তার এক বন্ধুকে ছাত্রলীগের কর্মী আখ্যা দিয়ে মারধর ও যৌন নিপীড়ন করা হয়। পরে তাকে আবার তুলে নিয়ে পোশাক খুলে ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর অভিযুক্তদের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে পরে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান।
ভুক্তভোগীরা জানান, হালিশহরের বেড়িবাঁধসংলগ্ন একটি স্থানে তাদের নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হতো। তারা ওই জায়গাকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অস্ত্রের মুখে টাকা আদায়ের অভিযোগ
সন্দ্বীপের মুছাপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী এক তরুণ পরিবারের সঙ্গে হালিশহরে থাকতেন। গত ১৫ মে সন্ধ্যা সাতটার দিকে হালিশহরের বি-ব্লকের এস ক্লাব মোড়ে নুর হোসাইন নুরু, আরিফ, রমিজসহ ২০ থেকে ২৫ জন তাকে ঘিরে ফেলেন। পরে তাকে একটি গলিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভুক্তভোগী তরুণ জানান, সেখানে নুর হোসাইন নুরু তার মাথায় পিস্তল ঠেকান। অন্যদের হাতে ছিল ছুরি। তারা তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। প্রাণভয়ে তিনি নগদ ৩০ হাজার টাকা দেন। পরে বিকাশের মাধ্যমে আরও ৫০ হাজার টাকা পাঠান। মোট ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তার অভিযোগ, এরপরও নুর হোসাইন নুরু তাকে ফোন করে দেখা করতে বলতেন। দেখা না করলে তার বাড়িতে পুলিশ পাঠানোর হুমকি দেওয়া হতো। এ পরিস্থিতিতে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হালিশহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
তুলে নিয়ে নির্যাতন, এক লাখ টাকা দাবি
হালিশহরে বসবাসরত সন্দ্বীপের মগধরা ইউনিয়নের বাসিন্দা এক কিশোরের অভিযোগ, গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে হালিশহরের গাউছিয়া মোড় থেকে নুর হোসাইন নুরুর নেতৃত্বে একটি দল তাকে তুলে নেয়। তাকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়। এ সময় মারধর করা হয় এবং তার পোশাক খুলে ভিডিও ধারণ করা হয়।
পরে তাকে বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই কিশোর জানায়, একই দিন রাত নয়টা থেকে দশটার মধ্যে বিকাশের মাধ্যমে একটি এজেন্ট নম্বরে চার দফায় টাকা পাঠানো হয়। নম্বরটি ০১৮১৮৪৮৪০১৬। তিন দফায় ৩০ হাজার টাকা করে এবং আরেক দফায় ১০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এভাবে মোট এক লাখ টাকা দেওয়ার পর তাকে ছাড়া হয়।
একই সময়ে গাউছিয়া মোড় থেকে আরও এক তরুণকে তুলে নেওয়া হয়। তার অভিযোগ, তাকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকেও এক লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরে রাত নয়টার দিকে তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে ছেড়ে দেওয়া হয়।
দুই দফায় তুলে নিয়ে একই কাজ
সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী এক তরুণের অভিযোগ, ২০২৫ সালের অক্টোবরে হালিশহরের ফইল্যাতলী এলাকা থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়। পরে একটি নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে তার অশ্লীল ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওই তরুণের ভাষ্য, একই বছরের ডিসেম্বরে তাকে আবারও তুলে নেওয়া হয়। ওই সময় তাকে মারধর করা হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এভাবে কাউকে একবার তুলে নিয়ে ভিডিও ধারণের পর সেই ভিডিওকে পরবর্তী সময়ে ভয় দেখানো ও চাপ সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করতেন অভিযুক্ত নুরু।
নুরুর থাবা হালিশহরজুড়ে
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হালিশহরের ফইল্যাতলী বাজার, বি-ব্লকের ট্রেড সেন্টার স্কুল মোড়, আই-ব্লকের মাছের বাজার, অন্ধ ফকিরের মাজার মোড় এবং বসুন্ধরা খেলার মাঠ এলাকায় অভিযুক্তদের আনাগোনা। এসব জায়গায় তাদের আটকে রাখা, ভয় দেখানো কিংবা দেখা করতে ডাকার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
অভিযোগ অনুযায়ী, নুর হোসাইন নুরু ও তার সহযোগীরা নিজেদের প্রভাব দেখাতে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানসহ বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, এসব ছবি দেখিয়ে তারা ভয় সৃষ্টি করেন।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, তাদের ভয় দেখাতে পুলিশকে ব্যবহারের কথাও বলা হতো। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া বা বাড়িতে পুলিশ পাঠানোর হুমকি দেওয়া হতো বলে তারা জানিয়েছেন।
সন্দ্বীপ থেকে হালিশহরে এসে আলোচনায়
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ বছর আগে সন্দ্বীপে একটি হামলার ঘটনার পর নুর হোসাইন নুরুর পরিবার পালিয়ে হালিশহরে চলে আসে। পরে তিনি গাউছিয়া মোড়ে ফলের দোকানে কাজ নেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই তাকে কখনও বিএনপি, কখনও আবার যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা যায় বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়।
নুর আলম ও নুরজাহান বেগমের ছেলে নুর হোসাইন নুরুর গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপের মাইটভাঙা ইউনিয়নের সারেং বাড়ি এলাকায়। বর্তমানে তিনি সপরিবারে হালিশহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের এ-ব্লক ৫ নম্বর গলিতে থাকেন। ছয় বছর আগে নুরু বিয়ে করেন।
স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুসারে, প্রায় দেড় বছর আগে নুরু কয়েকজনকে নিয়ে একটি দল গড়ে তোলেন। ওই দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে কিশোর-তরুণদের তুলে নেওয়া, নির্যাতন, ভিডিও ধারণ, চাঁদাবাজি এবং মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এসব ঘটনায় মোয়াজ্জেমসহ আরও কয়েকজনের নামও এসেছে।
৩৭ বছর বয়সী মোয়াজ্জেমের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার দক্ষিণপাড়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। বর্তমানে তিনি হালিশহরের কে-ব্লকের ওয়াপদা মোড়ের সিপিডিএল ভবনে থাকেন। তার বাবা রহমত উল্লাহ ও মা মনোয়ারা বেগম।
হালিশহর থানায় এবার মামলা
এসব অভিযোগের মধ্যে গত সোমবার (১২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদী ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর। তিনি সন্দ্বীপের মগধরা ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে হালিশহরের জে-ব্লকে থাকেন। মামলায় নুর হোসাইন নুরু ও মোয়াজ্জেমকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৮ আগস্ট সন্ধ্যা সাতটার দিকে হালিশহর থানার জে-ব্লকের ১ নম্বর সড়কের মোড়ে অবস্থান করছিলেন ১৭ বছর বয়সী ওই কিশোর। সে চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট এলাকায় একটি কাপড়ের দোকানে চাকরি করে। ওই সময় নুরু ও মোয়াজ্জেম তাঁকে ‘ছোট ভাই, এদিকে আসো’ বলে ডাকেন। কাছে গেলে তাঁকে জোর করে একটি অটোরিকশায় তুলে ফইল্যাতলী বাজারসংলগ্ন মেডিসিন বাজার নামের একটি ওষুধের দোকানের ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে ভয়ভীতি দেখিয়ে নুর তাঁকে জোরপূর্বক যৌন নিপীড়ন করেন। অপর আসামি মুয়াজ্জেম ও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা এতে সহযোগিতা করেন এবং মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। ঘটনার বিষয়ে কাউকে জানালে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে ওই দিন রাত একটার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আসামিদের ভয়ে প্রথমে তিনি কাউকে কিছু জানাননি।
ওই কিশোর অভিযোগ করেন, পরে নুরু ও তার সহযোগীরা তাঁকে আবারও খুঁজতে থাকেন এবং তাঁদের সঙ্গে আবার একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে চাপ দেন। এতে সাড়া না দেওয়ায় ধারণ করা ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার এবং তার বন্ধুদের কাছে পাঠানো হয়। নুরের ‘নূর হোসাইন নুরু’ নামের ফেসবুক আইডি থেকে ওই কিশোরের ফেসবুক আইডিতেও ভিডিও পাঠানো হয়।
ওই কিশোর শেষপর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় গিয়ে মামলা করেন। তার মতো আরও অনেকে একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন বলেও মামলার অভিযোগে লেখা হয়েছে।
মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন হালিশহর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াসিন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে চেষ্টা করেও নুর হোসাইন নুরু ও মোয়াজ্জেমের বক্তব্য জানা যায়নি।
সিপি
