গাইবান্ধার দারিয়াপুর হাজি ওসমান গণি কলেজে ১৫ বছর বিনা বেতনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেও স্থায়ী নিয়োগ পাননি লিলি রানী। দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা আর চাকরির আশ্বাসের পর শেষ পর্যন্ত পদটিতে নিয়োগ পেয়েছেন অন্য একজন। লিলি রানী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাকে বঞ্চিত করে অধ্যক্ষের ভাতিজিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগ পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ায় লিলি চাকরি পাননি বলে দাবি করেছেন পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি। এ ঘটনায় দীর্ঘদিন কাজ করেও চাকরি না পাওয়া লিলি রানীর পরিবারে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার দারিয়াপুরের গরুর হাট এলাকার বাসিন্দা লিলি রানী হরিজন সম্প্রদায়ের একজন দরিদ্র নারী। জীবিকার তাগিদে কলেজটিতে বছরের পর বছর পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার দাবি, চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দিয়েছিলেন কলেজ কর্তৃপক্ষ; কিন্তু নিয়োগের সময় সেই আশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেনি। বর্তমানে স্থায়ী চাকরি না পেয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তার।
ভুক্তভোগী, স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরম দারিদ্র্য ও অসুস্থতা নিয়েই কলেজে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন লিলি। বিনা বেতনে কিংবা নামমাত্র পারিশ্রমিকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলেও স্থায়ী নিয়োগের আশায় কাজ ছাড়েননি তিনি। কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, পদটি স্থায়ী হলে তার অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের শ্রমের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলে সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ তার পরিবারের।
কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. সেলিম, অধ্যক্ষ তোফাজ্জল ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন কাজ করা লিলি রানীকে বাদ দিয়ে নতুন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি অধ্যক্ষের ভাতিজি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লিলি রানী বলেন, ‘বিনা বেতনে ১৮ বছর খেটেছেন আমার বাবা। আমি ১৫ বছর কাজ করেছি। তবু পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি পেলাম না। সিঁড়ি বেয়ে, পেটে সন্তান নিয়েও কাজ করেছি। এর প্রতিদান এমন হবে, কখনো ভাবিনি। এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে করতেই আমার বাবা মারা গেছেন। এরপর আমি কাজ করেছি। অধ্যক্ষ স্যারের ভাতিজিকে আমার জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। অধ্যক্ষসহ সবাই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। চাকরিটা না থাকলে দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে খাব, সেই চিন্তায় দিন কাটছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রোশনা বেগম বলেন, লিলি দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করেছে। কিন্তু সভাপতি ও অধ্যক্ষ টাকা ভাগাভাগি করে ভুয়া নিয়োগ দিয়েছেন বলে আমাদের অভিযোগ। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। লিলিকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
মুন্নী রানী বলেন, এ কলেজে দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেওয়ার কথা ছিল। লিলি ও আমার ছেলে আপন যোগ্য ছিল। কিন্তু টাকার কাছে তারা বিক্রি হয়ে গেছেন। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।
লিলি রানীর ভাই সঞ্জীব বলেন, হিসাব অনুযায়ী বাবার জায়গায় আমার কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু বোনের দুটি সন্তানের কথা চিন্তা করে তাকে কাজ করতে দিয়েছি। এখন বোনের ১৫ বছরের শ্রম বৃথা গেল। আমরা তার স্থায়ী নিয়োগ চাই। সরকার যেন তার চাকরির ব্যবস্থা করে।
হরিজন সম্প্রদায়ের সদর উপজেলা নেতা শ্রী কীর্তন বাষ্প বলেন, ‘এটি শুধু লিলি রানীর সঙ্গে প্রতারণা নয়, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শ্রমকে অবমূল্যায়নের ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত। জীবনের ১৫ বছর একটি প্রতিষ্ঠানের সেবায় দেওয়ার পর এভাবে তাকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি নিয়োগ বাণিজ্য ও শ্রম শোষণের শামিল।’ তিনি ঘটনার তদন্ত করে লিলি রানীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তবে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করেছেন নিয়োগ পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহমেদ। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরাও জেনেছি, লিলি রানী ১৫ বছর কাজ করেছেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে তিনি কম নম্বর পাওয়ায় নিয়োগ পাননি। আমরা নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ দিয়েছি।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে দারিয়াপুর হাজি ওসমান গণি কলেজের অধ্যক্ষ তোফাজ্জলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে কথা বলতে রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, দুই দিন পরে আসেন, সব সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলব।
কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
