বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার এনায়েত উল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে চতুর্থ শ্রেণির পাঠদান চলাকালে হঠাৎ শ্রেণিকক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে তিন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনার পর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়, অথচ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতেই চরম আতঙ্ক নিয়ে চলছে পাঠদান। কেবল এই একটি বিদ্যালয়ই নয়, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার মোট ৮৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন বর্তমানে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় সাড়ে আটশ ভবনই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী।
জেলাওয়ারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বরিশাল জেলায় সবচেয়ে বেশি ৩২০টি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ছাড়া পিরোজপুরে ১৯৯টি, বরগুনায় ১৩২টি, ভোলায় ১১ ক্যাম্পাস, ঝালকাঠিতে ৮৫টি এবং পটুয়াখালীতে ২২টি বিদ্যালয় ভবন একই রকম নাজুক দশায় রয়েছে। বাবুগঞ্জ উপজেলার ছানিকেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৯৭ সালে নির্মিত হওয়ার পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কারের মুখ দেখেনি। একইভাবে ১৯৯৫ সালে নির্মিত বরিশাল সদর উপজেলার ৭৮ নম্বর আদর্শ মাতৃমন্দির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিন্টু কুমার কর জানান, প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও অদ্যাবধি কোনো সংস্কারকাজ করা হয়নি।
এনায়েত উল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহান উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনার পরও ভবনটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয় পক্ষকেই প্রতিদিন বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা নিয়ে ক্লাসে অংশ নিতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এসব জরাজীর্ণ ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার কারণে নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলশ্রুতিতে, সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে অভিভাবক মহলের। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অবিলম্বে এসব ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও শঙ্কামুক্ত শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
পরিস্থিতির বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে এই দুর্ভোগ লাঘব হবে। এদিকে, বরিশাল জেলা শিক্ষা প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম জানান, জরাজীর্ণ ভবনগুলোকে চারটি ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খুব শীঘ্রই সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের মনে যে গভীর শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত দূর করার তাগিদ দিয়েছেন সচেতন মহল।
