ভোরের আকাশে তখনো সূর্যের দেখা মেলেনি। চারপাশে হালকা অন্ধকার, প্রকৃতিজুড়ে নীরবতা। এরই মধ্যে মাজারের উঠানে ছড়িয়ে দেওয়া হলো ধান, চাল, গম আর রুটি। মুহূর্তেই চারদিক থেকে উড়ে এলো অসংখ্য কাক, কবুতর, দোয়েল ও চড়ুই পাখি। খাবার খেতে নেমে পড়ল তারা। পাখির ডানা ঝাপটানো আর কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয়ে উঠল মাজার প্রাঙ্গণ।
এ যেন প্রতিদিনের চেনা এক সকাল, যেখানে মানুষের ভালোবাসায় পাখিদের জন্য সাজানো হয় খাবারের আয়োজন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই ব্যতিক্রমী রীতিতে ভোরের প্রকৃতি পায় অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার খড়মপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কল্লা শহীদ (রহ.) মাজার শরীফে প্রতিদিন দেখা যায় এমন দৃশ্য। ভোর হলেই পাখিদের জন্য খাবার নিয়ে হাজির হন মাজারের সেবক। খাবার ছড়িয়ে দেওয়ার পরপরই পাখিদের কলকাকলিতে বদলে যায় মাজারের পরিবেশ।
## বছরের পর বছর ধরে ভালোবাসার আয়োজন
মাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, দীর্ঘ বহু বছর ধরে এখানে পাখিদের খাবার দেওয়ার রীতি চলে আসছে। মাজারের খাদেম ও সেবকদের পাশাপাশি মাজারে আসা ভক্ত-আশেকানদের কেউ কেউ পাখিদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন।
প্রতিদিন সকালে পাখিদের জন্য প্রায় তিন থেকে চার কেজি ধান, চাল ও গমের পাশাপাশি কয়েকটি পাউরুটি ঘি দিয়ে মাখিয়ে মাজারের উঠানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। খাবারের অপেক্ষায় থাকা পাখিরা দল বেঁধে নেমে আসে। কেউ খাবার কুড়ায়, কেউ ডানা মেলে উড়ে যায়, আবার কেউ একটু দূরে বসে অপেক্ষা করে।
খাবার খাওয়া শেষে পাখিগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। দিন শেষে সন্ধ্যার আগে আবারও মাজার প্রাঙ্গণে ফিরে আসে তারা। রাতে মাজারের চত্বরের গাছগুলোতে আশ্রয় নেয় পাখিরা।
## পাখিদের সঙ্গে শৈশবের স্মৃতি
মাজারের খাদেম কাজী মাইনুদ্দিন বলেন, প্রতিদিন ভোরে পাখিদের খাবার দেওয়া হয়। হাজার হাজার কাক, কবুতর, দোয়েল ও চড়ুই পাখি খাবার খেতে আসে। সকালে খাবার খেয়ে তারা বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। দিন শেষে আবার মাজারে ফিরে আসে এবং রাতে গাছগুলোতে আশ্রয় নেয়।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই মাজারে পাখিদের খাবার খেতে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই পাখিদের খাবার দেওয়া হচ্ছে।
মাজারের সেবক মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রতিদিন তিন থেকে চার কেজি ধান, চাল ও গমের সঙ্গে কয়েকটি পাউরুটি ঘি দিয়ে মাখিয়ে পাখিদের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এসে এসব খাবার খেয়ে যায়।
## পাখিদের কলকাকলিতে প্রশান্তি
খড়মপুর মাজার শরীফ কমিটির সদস্য মো. রনি খাদেম বলেন, বহু বছর ধরেই মাজারে পাখিদের খাবার দেওয়া হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে তিনি এই দৃশ্য দেখে আসছেন। সকালে পাখিদের দল বেঁধে খাবার খাওয়ার দৃশ্য দেখতে তাঁর খুব ভালো লাগে। মন জুড়িয়ে যায়।
শহর কিংবা গ্রামের ব্যস্ত জীবনে প্রকৃতির এমন নিবিড় দৃশ্য অনেকের কাছেই প্রশান্তির উৎস। খড়মপুর মাজারের এই নিয়মিত আয়োজন যেন মানুষ ও পাখির মধ্যে গড়ে ওঠা এক নীরব মমতার গল্প। এখানে পাখিদের জন্য খাবার ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় প্রাণের স্পন্দনে।
ভোরের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখিরা উড়ে যায় নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু রেখে যায় তাদের কিচিরমিচিরে ভরা এক টুকরো মুগ্ধতা। পরদিন ভোরে আবারও খাবারের অপেক্ষায় ফিরে আসবে তারা—আর মাজারের উঠানে নতুন করে রচিত হবে মানুষ ও পাখির ভালোবাসার চেনা গল্প।
The post ভোরের আলো ফোটার আগেই পাখিদের মিলনমেলা, খাবার জোটে কল্লা শাহ্ মাজারে appeared first on The voice of Brahmanbaria || Local news means the world is.
