ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির ভাষ্য, অভিযোগ গঠন বা মুক্তির তারিখ নির্ধারণ ছাড়াই আটকে রাখার ইসরায়েলি নীতি ‘আরেকটি লঙ্ঘন ও অপরাধ’। এর ফলে শিশুরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে এবং পরিবার ও শিক্ষাজীবনের স্থিতিশীলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অধিকারবিষয়ক সংগঠন ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি বলেছে, ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্য করে দমন-পীড়ন আরো বাড়িয়ে চলেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে সেখানকার কারাগারে অন্তত ৩৫০ ফিলিস্তিনি শিশু ‘কঠোর পরিস্থিতির’ মধ্যে রয়েছে। খবর আল জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মঙ্গলবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন থেকে অন্তত ছয় শিশুকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
সংগঠনটি জানিয়েছে, গাজায় কত শিশুকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। পাশাপাশি সেখানে জোরপূর্বক গুমের নীতিও অব্যাহত রয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির ভাষ্য, অভিযোগ গঠন বা মুক্তির তারিখ নির্ধারণ ছাড়াই আটকে রাখার ইসরায়েলি নীতি ‘আরেকটি লঙ্ঘন ও অপরাধ’। এর ফলে শিশুরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে এবং পরিবার ও শিক্ষাজীবনের স্থিতিশীলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কারাগারে ফিলিস্তিনি শিশুদের অবস্থা
প্রতিবেদনে ইসরায়েলি বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে। শিশুদের ‘ভয় দেখানো ও আটকের’ মধ্য দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা গড়ায় ‘নির্যাতন, অনাহারে রাখা এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করার’ পর্যায়ে।
প্রতিবেদনে ১৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ হামিদের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ওফের কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় ছোঁয়াচে চর্মরোগ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয় এ কিশোর। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই কারাগারে নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ নথিবদ্ধ করে আসছে।
হামিদের শরীরে গুরুতর সংক্রমণ দেখা দেয়। হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচার করা হয় এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। পরে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
প্রতিবেদনে ১৭ বছর বয়সী ওয়ালিদ আহমেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মেগিদ্দো কারাগারে ছয় মাস আটক থাকার পর ২০২৫ সালের মার্চে এ কিশোরের মৃত্যু হয়। গত ডিসেম্বরে এক ইসরায়েলি বিচারক তার মৃত্যুর তদন্ত স্থগিত করেন। বিচারকের বক্তব্য ছিল, আহমেদকে অনাহারে রাখার প্রমাণ থাকলেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
ইসরায়েলের কারাগারে মার্কিন শিশুরাও
মেগিদ্দো কারাগারে আহমেদের সঙ্গে তার বন্ধু মোহাম্মদ ইব্রাহিমও আটক ছিল। ইব্রাহিম যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এক কিশোর। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের প্রচার-প্রচেষ্টা এবং জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতাদের আহ্বানের পর কয়েক মাসের মাথায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়।
অভিযোগ গঠন ছাড়াই ইসরায়েলের কারাগারে আটক থাকা তরুণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ইব্রাহিমই একমাত্র নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে গভীর রাতে পশ্চিম তীরে নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আবদালকারিম ঈসা আহমেদ সাফিকে আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। আটক অবস্থাতেই তার ১৮ বছর পূর্ণ হয়। পরে কর্তৃপক্ষ তাকে কিশোরদের জন্য নির্ধারিত আটককেন্দ্র থেকে ওফের কারাগারের প্রাপ্তবয়স্ক বন্দিদের অংশে স্থানান্তর করে।
একইভাবে জুলাইয়ে ১৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক আদম ওয়াজেহ আবদেলফাত্তাহ কারাকরাহকেও আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। পরিবারের পক্ষ থেকে জামিনের ব্যবস্থা করায় আগস্টে তার মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করেই মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
ইচ্ছামতো আটক রাখা শিশুদের মুক্তি নিশ্চিত, তদন্ত কার্যকর এবং ইসরায়েলের কারাগারগুলোয় নির্যাতন, অনাহারে রাখা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার অবসান ঘটাতে ‘কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ’ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে ২৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজায় আটক করা হয়েছে আরো হাজার হাজার মানুষকে।
