মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার মাইনে আঘাত পেয়ে আগুনে জ্বলেছে বলে জানিয়েছে ইরানের সংবাদমাধ্যম ফার্স। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রণালির ওপর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা
জোরদার করেছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে কাতার।
এদিকে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলা থেকে সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দিকে ছোড়া হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর দেশটিতে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
হরমুজ প্রণালিতে মাইনে আঘাত পেয়ে দুটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যাওয়ার খবর দিয়েছে ইরানের সংবাদমাধ্যম ফার্স। আইআরজিসির বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনার পর সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রকে হুশিয়ারি দিয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ঔদ্ধত্যপূর্ণ শাসনের পক্ষ থেকে এসব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে তেল কোম্পানিগুলোকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে।’
প্রণালির ওপর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে ঘিরে সামরিক তৎপরতার খবরও পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ১২১ নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি ট্যাংকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে। গ্রিনিচ মান সময় সকাল ১০টার দিকে জাহাজটি ওই অঞ্চলে চলমান সামরিক তৎপরতার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সংস্পর্শে আসে। তবে কোন বাহিনী এতে জড়িত ছিল এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, আগের দিন হরমুজ প্রণালির ওপর একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। এ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের কারণে এ অঞ্চলে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কাতারও বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে এবং ইরানকে সেখানে হামলা বন্ধ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং উভয় পক্ষই কূটনৈতিক যোগাযোগে যুক্ত রয়েছে।
কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে আল-আনসারি বলেন, ‘আলোচনার বিষয়ে বলতে গেলে, তা অব্যাহত রয়েছে। আমরা পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ দেখতে পাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘সামরিক সমাধানের কোনো পথ নেই। উত্তেজনা বাড়ানো যাবে না। শান্তিপূর্ণ সমাধান আলোচনার টেবিলেই থাকতে হবে।’
এদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছেন। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর এ খবর জানিয়েছে। তাসনিম সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে মুনির তেহরান সফর করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হবে। তবে বৈঠকের মূল লক্ষ্য দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দুই পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে দেশটি। গত জুনে ইসলামাবাদে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর এটি মুনিরের পঞ্চম ইরান সফর।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষা করা ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অপরিবর্তনীয় নীতি। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, কূটনৈতিক পথ কিংবা বৈধ আত্মরক্ষার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা দেশটির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ইয়েমেন সংকট নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন বাঘাই। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে এ সংকটের সমাধান হওয়া উচিত। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনের মানুষ ‘অবৈধ ও অমানবিক অবরোধের’ শিকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
ইরানি-আমেরিকান সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভি বলেছেন, ইরানের নেতৃত্ব যুদ্ধটিকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে। দোহায় গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ইরান দুর্বল এবং দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ দ্রুত ও সহজেই শেষ করা যাবে।
মোর্তাজাভি বলেন, ইরান এ যুদ্ধকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। যুদ্ধের সময় আগের নেতৃত্বের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর যারা দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের কাছেও বিষয়টি একই রকম গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা থেকে সৌদি আরবকে রক্ষায় যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় রয়্যাল এয়ারফোর্সের টাইফুন যুদ্ধবিমান দিয়ে প্রতিরক্ষামূলক আকাশ টহল পরিচালনা করা হবে।
ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, টাইফুন যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি আরবের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করবে। তবে ইয়েমেনের ভেতরে কোনো আক্রমণাত্মক অভিযান চালাবে না।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে আড়াই লাখের বেশি মানুষ নিজ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির মুখপাত্র ম্যাথিউ সল্টমার্শ জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে ইউএনএইচসিআর গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তিনি জানান, গত ১ আগস্ট থেকে ১৭ অক্টোবরের মধ্যে ইয়েমেনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইয়েমেন বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে ব্যাপক মানবিক সংকট চলছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হুথিরা দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রায় চার বছর ধরে চলা অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতির পর গত জুলাইয়ে সংঘাত নতুন করে শুরু হয়। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত ভূখণ্ড হুথিদের দখলে যাওয়ার পর লড়াই আরও তীব্র হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এফআইআই) আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। আয়োজকেরা সোমবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সম্মেলনটি আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এটি ছিল আয়োজনটির দশম সংস্করণ। নতুন তারিখ খুব শিগগির ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বের শীর্ষ অর্থদাতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে সম্মেলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক বৈঠনের আদলে একে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘মরুভূমির দাভোস’ বলা হয়। সৌদি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশটির উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি থেকে পর্যটন, খেলাধুলা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
