দিন বদলের গল্পে জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে চন্দনা রানীর সংসারে সচ্ছলতা
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
- আপডেট সময় : ০৪:৫১:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
বাড়ির উঠানে সারি সারি বস্তায় আদা চাষ। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পাত্র ও ক্যারেটে মরিচ। মাচায় নানা ধরনের সবজি। পুকুরে মাছ, পাড়ে ফলের গাছ। এক পাশে ঔষধি গাছের বাগান, অন্য পাশে স্থানীয় জাতের হাঁস-মুরগি, ছাগল ও গরু। বাড়ির আঙিনাজুড়ে যেন ছোট্ট একটি কৃষি পাঠশালা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের চন্দনা রানীর (৩০) বাড়ির চিত্র এখন এমনই। জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাতের মধ্যে স্থানীয় প্রযুক্তি ও অভিযোজন কৌশল কাজে লাগিয়ে বসতবাড়িকেই তিনি পরিণত করেছেন বহুমুখী কৃষি খামারে। সেই খামার থেকে খাদ্যের জোগান যেমন মিলছে, তেমনি বিভিন্ন উৎস থেকে আয়ও হচ্ছে পরিবারের।
চন্দনা রানীর স্বামী রঞ্জন মণ্ডল (৩৪) দিনমজুর। তাঁদের দুই সন্তান—ছেলে সজীব মণ্ডল (৯) ও মেয়ে ধৃতি মণ্ডল (৩)। প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর তাঁদের বসতভিটা। একসময় সীমিত আয়ের এই পরিবারে স্বচ্ছলতা ছিল না। এখন বাড়ির জমি ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ধীরে ধীরে বদলে গেছে তাঁদের জীবনযাত্রা।
চন্দনা রানী বলেন, ‘আমরা নিজেরা বিষ খাই না, অপরকেও বিষ খাওয়াতে চাই না। সাহস আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে উন্নয়ন সম্ভব।’
এই ভাবনা থেকেই তিনি জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন শুরু করেন। জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে মৌসুমি সবজি চাষের পাশাপাশি স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ ও উৎপাদনে গুরুত্ব দেন। নিজের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন দেশীয় বীজ ব্যাংক। সেখানে বিভিন্ন জাতের বীজ সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিনিময় করা হয়।
চন্দনার বাড়িতে রয়েছে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা। রান্নার কাজে ব্যবহার করেন জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব চুলা। মাটির তৈরি হাজল ব্যবহার করে হাঁস-মুরগির ডিম ফোটানোর কাজও করেন তিনি।
তাঁর খামারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একই জায়গায় একাধিক উৎপাদন ব্যবস্থা। পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে ফলের গাছ এবং পানির ওপর মাচা তৈরি করে সবজি চাষ করছেন। বাড়ির বিভিন্ন স্থানে বেড পদ্ধতিতে সবজি, বস্তায় আদা এবং ফেলে দেওয়া পাত্রে মরিচ চাষ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রজাতির চারা উৎপাদনের জন্য রয়েছে ছোট নার্সারিও।
শুধু নিজের পরিবার নয়, আশপাশের নারীদেরও এই কাজে যুক্ত করেছেন চন্দনা রানী। তাঁদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি ছোট সংগঠন। সংগঠনের মাধ্যমে পরিবেশ, মানবিক সহায়তা ও কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সভা ও সেমিনারে অংশ নিয়ে অন্যদেরও পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চায় উৎসাহিত করেন তিনি।
চন্দনা রানীর উৎপাদিত সবজি, বীজ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবারের চাহিদা মেটানোর পর স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি বাড়িতে সেলাই মেশিনের কাজ করেও আয় করছেন তিনি। ফলে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, সেলাইসহ বিভিন্ন ছোট ছোট উৎস এখন পরিবারের আয়ের অংশ।
চন্দনা বলেন, ‘এখন আমার পরিবারের সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। আমি নিয়মিত সঞ্চয় করছি। আমার স্বপ্ন, বসতঘরটি সুন্দর করব এবং দুই সন্তানকে লেখাপড়া শেখাব।’
উপকূলীয় শ্যামনগরে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাতসহ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাব রয়েছে। এমন বাস্তবতায় চন্দনা রানীর বাড়ির কৃষি ব্যবস্থা শুধু একটি পরিবারের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নয়, স্থানীয়ভাবে টেকসই কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার একটি উদাহরণও তৈরি করেছে।
কৃষির সঙ্গে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ এবং এক জমিতে একাধিক উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয় তাঁর খামারকে অন্যরকম বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। স্থানীয় সম্পদ ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সীমিত জায়গা থেকে কীভাবে পরিবারের খাদ্য ও আয়ের ব্যবস্থা করা যায়, তাঁর উদ্যোগে তারই একটি বাস্তব চিত্র দেখা যায়।
চন্দনা রানীর মতো উপকূলীয় নারীদের স্থানীয় জ্ঞান ও অভিযোজন অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা ও আয় বৃদ্ধিতে তা ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর ছোট্ট কৃষি খামার তাই শুধু একটি পরিবারের দিন বদলের গল্প নয়; উপকূলের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকারও একটি উদাহরণ।
