সমুদ্রের তলদেশের অপটিক্যাল ফাইবার ও ইন্টারনেট দখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্নায়ুযুদ্ধ। একুশ শতকের স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসিতে যে দেশ যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করে, সেই দেশ তত বেশি এগিয়ে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি হলো ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তি। বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদান ও ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন পরিচালিত হয় সমুদ্রের তলদেশে বিছানো সাবমেরিন অপটিক্যাল ফাইবার কেব্্লের মাধ্যমে। এই বিশাল তথ্য মহাসড়কই মূলত আধুনিক মানবসভ্যতার অদৃশ্য স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে কাজ করছে। সাগরের গভীরের এই গোপন অবকাঠামো বর্তমান বিশ্বের শক্তির নতুন উৎস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে কোনো পরাশক্তি যদি সাগরের তলদেশের এই ফাইবার কেব্্ল ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে সে খুব সহজেই গোটা পৃথিবীর অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থা শাসন করতে পারবে। সাগরের গভীরে অপটিক্যাল ফাইবার দখল এবং তথ্য চুরির প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত গোষ্ঠী নানা কৌশলে সাগরতলের তথ্যের ওপর আড়ি পাতছে। আধুনিক বিশেষায়িত সাবমেরিন এবং পানির নিচের রোবোটিক ড্রোন ব্যবহার করে কেব্্লের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আলোসংকেতকে বিঘিœত না করেই তথ্য চুরি করা সম্ভব হচ্ছে। একে বলা হয় ফাইবার চিপিং বা অপটিক্যাল ট্যাপিং, যার মাধ্যমে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং বিবরণী ও গোপন সরকারি বার্তা মুহূর্তেই অন্যের হাতে চলে যায়। তা ছাড়া সাগরতলের ফাইবার ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোয় নিজেদের অবকাঠামো বসিয়ে কোনো দেশের সামগ্রিক নেটওয়ার্ক জিম্মি করার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের গভীরে এ ধরনের নজরদারি ও তথ্য চুরি যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বড় হুমকি তৈরি করছে।
সাগরের তলদেশে যোগাযোগের এই নিয়ন্ত্রণ এবং দখলের ইতিহাস বেশ পুরোনো। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ১৮৫৮ সালে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে প্রথম ট্রান্স আটলান্টিক টেলিগ্রাফ কেব্্ল স্থাপন করা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল যে তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদানই বৈশ্বিক ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক পরমুহূর্তেই ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী জার্মানির পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক টেলিগ্রাফ কেব্্ল কেটে দিয়েছিল। এটিই ছিল বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম সুসংগঠিত কেব্্ল যুদ্ধ, যার মাধ্যমে পুরো বিশ্ব থেকে জার্মান সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং শীতল যুদ্ধের সময়েও বিভিন্ন পরাশক্তি পরস্পরের পানির নিচের যোগাযোগ লাইনে আড়িপাতার জন্য গোপন সাবমেরিন অভিযান পরিচালনা করত। বিশ শতকের শেষে অপটিক্যাল ফাইবারের আবিষ্কার এবং ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে এই যুদ্ধের মাত্রা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক জলসীমার এই গোপন যুদ্ধ রোধ করা এবং ফাইবার কেব্্লের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো একক দেশের পক্ষে সাগরের বিশাল তলদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তাই এর জন্য বিশ্বব্যাপী একটি ঐক্যবদ্ধ আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জলসীমায় সমুদ্রতলের ফাইবার কেব্্ল নাশকতামূলকভাবে কাটা বা তথ্য চুরি করাকে কঠোর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সমুদ্রের গভীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিশেষ সেন্সর ও ড্রোন মোতায়েন করে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাকআপ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যাতে একটি নির্দিষ্ট কেব্্ল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বৈশ্বিক ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ না হয়ে যায়। ভূ-রাজনৈতিক কোন্দল দূর করে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার মাধ্যমে সাগরতলের মূল অবকাঠামো রক্ষা করা সম্ভব।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির জন্য ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে এ বিষয়টির গুরুত্ব অপরিসীম। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি অন্যতম মূল ডিজিটাল হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। বাংলাদেশকে বর্তমানে কেবল সাবমেরিন কেব্্লের ওপর নির্ভর না করে একাধিক বিকল্প কেব্্ল সংযোগের মাধ্যমে শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।
সমুদ্রতলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে নিজস্ব নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কেব্্ল কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে নিজেদের ডেটা সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করা সম্ভব। অদূর ভবিষ্যতে সাগরের অপটিক্যাল ফাইবার ও ইন্টারনেট সংযোগের সঠিক এবং নিরাপদ ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগের উন্মোচন করবে। একটি সুরক্ষিত ও নিরবচ্ছিন্ন ফাইবার নেটওয়ার্ক দেশের ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে বিশ্বদরবারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের আঞ্চলিক ডেটা সেন্টার স্থাপনে আগ্রহী হবে, যা প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। সাবমেরিন কেব্্লের মাধ্যমে প্রতিবেশী ল্যান্ডলকড বা ভূ-বেষ্টিত দেশগুলোয় উচ্চগতির ইন্টারনেট রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। নিরাপদ ডিজিটাল যোগাযোগ দেশীয় শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে দেবে।
একটি সুরক্ষিত সমুদ্রতলীয় ফাইবার নেটওয়ার্ক বিশ্বশান্তি এবং আধুনিক প্রগতির নতুন সোপান হতে পারে। আমরা যদি সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করি এবং সমুদ্রের অপটিক্যাল ফাইবারকে নাশকতার যুদ্ধক্ষেত্র না বানিয়ে প্রগতির হাতিয়ার করি, তবে মানবজাতি এক আলোকময় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। মহাসাগরের তলদেশের অগাধ সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তির সঠিক বিকাশ বিশ্বকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় করে এই ডিজিটাল অর্থনৈতিক যাত্রায় অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
