সড়কের পাশের গাছ কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান নয়; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ কমানো এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও এসব গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ব্যস্ততম আদমপুর সড়কের পাশ থেকে ইউক্যালিপটাস, জামসহ বিভিন্ন প্রজাতির ১৪টি বিশাল আকৃতির গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা পরিবেশের নিরাপত্তা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
আমাদের সময়ে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়Ñ গত বুধবার রাতে উপজেলার ঘোড়ামারা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। চুরি হওয়া গাছগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য সাত-আট লাখ টাকা। অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এ কারণে যে, ঘটনাস্থলের কাছেই রাজকান্দি বন রেঞ্জ কার্যালয় ও সড়কের চেকপোস্ট রয়েছে। সেখানে পুলিশের টহলও চলে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছে। এত বড় আকৃতির ১৪টি গাছ কেটে খণ্ডাংশ করে যানবাহনে তুলে নিয়ে যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগার কথা। তার পরও কীভাবে এ ঘটনা ঘটল, তার জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। এ ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন চুরি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য থাকা গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও প্রকাশ করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির আশঙ্কা, এর পেছনে সংঘবদ্ধ চক্র থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়। বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, কীভাবে গাছগুলো কাটা ও পরিবহন করা হলো এবং কোথায় সেগুলো বিক্রি করা হয়েছে, তা শনাক্ত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, যানবাহন চলাচলের তথ্য এবং কাঠের ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র যাচাই করা যেতে পারে। গাছ কাটার সরঞ্জাম, পরিবহনের ধরন ও সম্ভাব্য বিক্রয়কেন্দ্র সম্পর্কেও অনুসন্ধান প্রয়োজন। অপরাধে কারও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সড়কের পাশের গাছগুলোর মালিকানা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কারÑ তা স্পষ্ট করা দরকার। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে কোনো সম্পদের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত হয় না। দায়িত্বের এই অস্পষ্টতা দূর করতে সড়কসংলগ্ন গাছের তালিকা তৈরি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং গাছ কাটার অনুমতি ও পরিবহন পর্যবেক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থাও থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, গাছ চুরির ক্ষতি শুধু আর্থিক মূল্য দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একটি বড় গাছ বেড়ে উঠতে বহু বছর সময় লাগে। সেটি কেটে ফেললে পরিবেশ যে ক্ষতির মুখে পড়ে, নতুন চারা রোপণ করলেই তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ হয় না। তাই চুরি হওয়া গাছ উদ্ধারের চেষ্টা এবং দায়ীদের বিচারের পাশাপাশি উপযুক্ত প্রজাতির গাছ লাগানো ও সেগুলোর পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষার কথা বলা যতটা জরুরি, বাস্তবে গাছের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কমলগঞ্জের এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য সতর্কবার্তা। তদন্তের আশ্বাস যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। অপরাধীদের শনাক্ত করা, দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তা খতিয়ে দেখা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গাছ রক্ষা মানে শুধু সবুজ রক্ষা নয়, জনসম্পদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশগত অধিকার রক্ষা করা।
