কুমারের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় একখ- কাদামাটি পায় নতুন প্রাণÑ হাঁড়ি, কলস, সরা কিংবা হরেক রকমের বাহারি খেলনা। সময়ের বিবর্তনে আর আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ মৃৎশিল্প কিছুটা জৌলুস হারালেও, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার পালপাড়াগুলোতে ফিরে এসেছে কর্মমুখর পরিবেশ।
দুর্গাপূজা ও মেলাকে কেন্দ্র করে পালপাড়া এবং চ্যাঙ্গা পালপাড়ার কারিগররা দিন-রাত এক করে কাজ করছেন। চ্যাঙ্গা পালপাড়ার স্বপন পাল ও অসীম পাল এবং পৌর পালপাড়ার সুদেব পাল ও নরেশ পালসহ মৃৎশিল্পীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন পার করছেন চরম ব্যস্ত সময়। মহল্লার প্রতিটা বাড়ির উঠোন যেন এখন মাটির পণ্যের প্রদর্শনী। কেউ মাটির ছাঁচে তৈরি করছেন কদমা-পুতুল ও পয়সা জমানোর ব্যাংক, কেউ ব্যস্ত বৈচিত্র্যময় খেলনা গড়তে, আবার কেউবা নিপুণ হাতে রং-তুলির আঁচড়ে সাজিয়ে তুলছেন মাটির ফলমূল, দেব-দেবীর সরঞ্জাম ও নান্দনিক হাঁড়ি-পাতিল।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন ম-পের পাশাপাশি দেশের নানা স্থানে বসে ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য মেলা। প্রতিবছর এসব মেলায় মাটির তৈরি নানা জিনিসপত্রের চাহিদা থাকে চোখে পড়ার মতো। সেই চাহিদা মেটাতে ও মেলার পসরা সাজাতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই পালবাড়ির নারী-পুরুষদের। তবে এ কর্মব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে কারিগরদের দুশ্চিন্তার ছাপ। কারিগর সুদেব পাল আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, মাটির পণ্য তৈরির প্রতিটি উপাদানের দাম এখন আকাশছোঁয়া। মাটি কেনা থেকে শুরু করে কাঁচা পাত্র পোড়ানোর খড়-লাকড়ি এবং ফিনিশিংয়ের রংÑ সব কিছুতেই বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। ফলে দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও কাক্সিক্ষত লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি। কারিগরদের স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান, আধুনিক নকশার পণ্য তৈরিতে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে ডিজিটাল ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা গেলে এ খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তাছাড়া, প্লাস্টিক দূষণের এই যুগে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে মাটির বাসনের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ মানুষকে মাটির গৃহস্থালি জিনিসপত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি। মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে আছে রূপসী বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মৃৎশিল্পীদের জীবনসংগ্রামের গল্প। আধুনিকতার স্রোতে সেই শিল্প ও কারিগরদের অস্তিত্ব যেন হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
