কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গণহত্যা, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতি ইঙ্গিত করে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেছেন, বারুদের গন্ধ আর রক্তমাখা অতীত নিয়ে একটি কনফারেন্স করেই যারা সব পাল্টে দেয়ার স্বপ্নে বিভোর, তাদের বলি, হল ভাড়া নেয়া যায় কিন্তু অতীত মুছে ফেলা যায় না।
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আ্যাকাউন্টে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওয়াশিংটন প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা সাংবাদিক এবং অধিকার কর্মী এই রাষ্ট্রদূত বলেন, “প্রেসক্লাবে কক্ষ ভাড়া করে অনুষ্ঠান করা যায়, তাতে প্রেসক্লাবের সমর্থন বা ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি ভাড়া পাওয়া যায় না।”
গণহত্যাকারী হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যখন ওয়াশিংটন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে কোনো সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হত তখন দলীয় গুন্ডাবাহিনী এবং দূতাবাসের লোকদের লেলিয়ে দেওয়া হতো উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত মুশফিক লিখেছেন, “আজ ওয়াশিংটন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবের এক সিনিয়র আমেরিকান সাংবাদিক জানালেন, গতকাল প্রেসক্লাবের ১৩ তলায় ভাড়া করা একটি কক্ষে অনুষ্ঠান চলতে দেখে তিনি ঢুকে পড়েছিলেন, আমার কোনো অনুষ্ঠান ভেবে। পরে দেখেন, সেটি বাংলাদেশের পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অনলাইন অংশগ্রহণে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’র আয়োজনে তাঁর পুত্র জয়ের একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের কিছু উৎসাহীকে বগল বাজাতে দেখে ভাবলাম, যে প্রেসক্লাবে আমরা কোনো অনুষ্ঠান করলেই ‘ষড়যন্ত্র’ তকমা দিয়ে দলীয় কর্মীবাহিনী আর দূতাবাসের কর্মকর্তাদের লেলিয়ে দেয়া হতো, সেই প্রেসক্লাবের ভাড়া করা কক্ষই এখন তাদের আশ্রয়!”
তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের বেশিরভাগ অনুষ্ঠানগুলো হতো সদস্যদের জন্য নির্ধারিত কমপ্লিমেন্টারি কক্ষ—ম্যাকক্লেন্ডার বা কসগ্রোভ লাউঞ্জে। প্রাইভেট ইভেন্ট হলে ওরা জানতে পারতোনা। কিন্তু পাবলিক হলেই দল বেঁধে হাজির হতো। দূতাবাসের অতিউৎসাহীরা এসে ছবি তুলতেন। কারা এসেছেন, কারা কথা বলেছেন, সেসব নথিবদ্ধ করাও যেনো তাদের কূটনৈতিক দায়িত্বের অংশ ছিল! তাদের কেউ কেউ এখনো বহাল তবিয়তে।
একবার উইলসন সেন্টারে আয়োজিত প্রফেসর আলী রীয়াজের একটি বইয়ের আলোচনা অনুষ্ঠানে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎকালীন উপমিশনপ্রধান মাহবুব সালেহর নেতৃত্বে যুবলীগের একদল লোক জোর করে ঢুকে পড়ে। মাহবুব, আলী রীয়াজকে উদ্দেশ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তৃতা দিতে শুরু করেন এবং টেবিল চাপড়ান। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীদের ডাকতে হয়। যাওয়ার সময় বাইরে রাখা কয়েকটি বইও চুরি করে নিয়ে যায় সঙ্গে আসা ওয়াশিংটন যুবলীগের নেতারা।”
রাষ্ট্রদূত মুশফিক বলেন, “এখন কোনো চেঁচামেচি বা দূতাবাসের চোখরাঙানি ছাড়াই সেই গুম-খুনের হোতারা (আওয়ামী লীগ) সাফাই গাইতে শুরু করেছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা সবাই এখন ‘নিরপেক্ষ’! কার কখন বিবেক জাগে, আর কখন নিরপেক্ষতার প্রয়োজন পড়ে, সেই হিসাবও কম চমকপ্রদ নয়।”
পলাতকদের অবশ্য মাত্র শুরু উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত মুশফিক লিখেছেন, “ওয়াশিংটনে টাকা ছিটালে মুড়িমুড়কির মতো লবিস্টফার্ম পাওয়া যায়। লুটপাটের টাকা থাকলে খরচ করতেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যোগাযোগ (Connection) আর বিশ্বাসযোগ্যতা (Credibility) টাকা দিয়ে কেনা যায় না। সেগুলো অর্জন করতে হয়। এই বেল্টওয়েতে তা আমরা তিলে তিলে গড়ে তুলেছি । আমাদের অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ এখন কাজে লাগানোর সুযোগ অবারিত নাহলেও, অর্জনের ক্ষয় নেই।”
সরকারের চারপাশে এখন অবশ্য দুধের মাছির সংখ্যাও নেহাত কম নয় মন্তব্য করে মুশফিক লিখেছেন, “ওয়াশিংটন প্রেসক্লাবে ভুঁইফোড় অনুষ্ঠান আয়োজনকারীদের বিগত দিনের অপশাসন, হত্যা, গুম-খুনের মুখোশ উন্মোচনে অন্তত টানা ১৫ বছর কসরত করতে হয়েছে। শতাধিক প্রাইভেট-পাবলিক ইভেন্ট, পরিস্থিতি বিশ্লেষণমূলক অধিবেশন, ওয়েবিনার, গোলটেবিল আর প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন ছাড়াও দিনের পর দিন দরজায় কড়া নাড়তে হয়েছে, সঠিক তথ্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আস্থা অর্জন করতে হয়েছে। আজকের এই অবস্থান কোনো ভাড়া করা কক্ষের এক বিকেলের ফসল নয়।”
আওয়ামী লীগের রক্তাক্ত দুঃশাসনের দিকে ইঙ্গিত করে এই রাষ্ট্রদূত লিখেছেন, “হল ভাড়া নেয়া যায় কিন্তু অতীত মুছে ফেলা যায় না। এতো সোজা নারে! আপাতত হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার ভাষায়, “হনুজ দিল্লি দূর অস্ত”।”
