রুহিয়া (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা:
পেটের দায়ে রাজধানীতে কাজ করতে গিয়ে পৈশাচিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৯ বছরের শিশু সুফিয়া। নির্মম এই নির্যাতনের ক্ষতবিক্ষত শরীরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সুফিয়ার নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ায় চরম ক্ষোভ আর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আইনের শাসনের তোয়াক্কা না করে একটি অবুঝ শিশুর ওপর এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালানোয় ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সর্বস্তরের মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুফিয়ার বাবা-মা জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকেন। শিশুকন্যা সুফিয়াকে তারা রেখে যান ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া ঘনিবৃষ্টপুর পঞ্চায়েত পাড়ার নানী জুলফা বেগমের কাছে।
১৩ মাস আগে নাতনির ভালো থাকা ও উন্নত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে এলাকার পরিচিত উসমান আলীর হাতে তুলে দেন নানী। সেই সুবাদে উসমান আলী সুফিয়াকে ঢাকায় অবস্থানরত তার বোন রিমি আক্তার ও ভগ্নিপতি আহসান দম্পতির বাসায় বাচ্চা দেখাশোনার কাজের জন্য পাঠান।
কিন্তু ঢাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই শিশুটির কপালে নেমে আসে দুর্ভাগ্যের কালো ছায়া। শুরু হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সামান্য অজুহাতে সুফিয়ার ওপর চালানো হতো নিষ্ঠুর আচরণ। কখনো ফ্রিজ নষ্ট করার মিথ্যা অপবাদ, কখনো আবার পোশাক বা টাকা চুরির অবাস্তব অভিযোগ এনে তাকে প্রতিনিয়ত লাঠিপেটা করা হতো। ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা চুরির বানোয়াট অজুহাতে তাকে বেধড়ক মারধর করার প্রমাণ মিলেছে। সুফিয়ার কোমল শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের লাল-কালো ক্ষতের দাগ এবং তার ভয়ার্ত মুখাবয়ব যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার মতো।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুফিয়ার নানী জুলফা বেগম বলেন, “আমরা অভাবের কারণে নাতনিকে কাজের জন্য দিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমার অবুঝ বাচ্চাটাকে এভাবে মারধর করবে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। সামান্য অজুহাতে প্রতিদিন ওকে লাঠি দিয়ে পেটানো হতো।” এই বর্বরোচিত ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত গৃহকর্তা রিমি আক্তারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং কোনো সদুত্তর দেননি।
ঢাকার বাসায় নির্মম নির্যাতনের শিকার শিশুটিকে পরবর্তীতে উদ্ধার করে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে আনা হলেও তার শরীরের ক্ষত এবং মনের ভেতরের গভীর ট্রমা সহজে কাটার নয়। এই পৈশাচিক ঘটনায় রুহিয়ার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরাও।
ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে রুহিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আবদুল মান্নান বলেন, “সকালে পরিষদে গিয়েই এটা দেখেছি। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। একটি অবুঝ শিশুর ওপর কীভাবে মানুষ এমন পৈশাচিক নির্যাতন চালাতে পারে, তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।”
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য সারোয়ার হোসেন বলেন, “এই বর্বর ঘটনা কোনো মানুষ মেনে নিতে পারে না। অবুঝ শিশুটির ওপর যেভাবে অত্যাচার চালানো হয়েছে, তার কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া দরকার।”
শিশু শ্রমের আড়ালে বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন নতুন নয়। তবে সুফিয়ার ওপর চালানো নির্যাতনের মাত্রা মানবতাকেও হার মানিয়েছে। সামান্য অভাবের সুযোগ নিয়ে একটি শিশুর শৈশবকে যারা এভাবেই ক্ষতবিক্ষত করেছে, সেই রিমি আক্তার ও তার স্বামী আহসানসহ সংশ্লিষ্টদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ। সুফিয়ার পরিবার ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত এই পৈশাচিক ঘটনার মূল উৎপাটন করবে এবং দোষীদের কঠোর আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
