ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে আমরা সবাই কথা বলছি। কিন্তু ভবিষ্যতের বাংলাদেশটি কেমন দেখতে চাই? অবশ্যই আমরা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সুন্দর দেখতে চাই।
স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শীর্ষক সুন্দর এ পলিসি কনক্লেভের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। এ আলোচনা যদি শুধু এ ঘরের মধ্যে বা কোনো এসি রুমের মধ্যে রাখি তাহলে তার প্রতিফলন দেখতে পাব না। শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্মার্ট আবাসন ও টেকসই নগরায়ণের বার্তাটা ছড়িয়ে দিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, এ আলোচনাকে যদি আমরা শুধু এ ঘরের মধ্যে না রেখে দেশের সব বড় শহর, বিভাগীয় ও জেলা শহরে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে প্রতিটি নাগরিককে সচেতন করা সম্ভব হবে। নাগরিকের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলেই আমরা স্মার্ট আবাসনের দিকে যেতে পারব।
এখন গ্রামে গেলে আপনি স্মার্ট আবাসন দেখতে পাবেন না। স্মার্ট গ্রামের কথা যদি বলি, সেখানে দেখা যায় একজন ব্যক্তি বিদেশে ছিলেন বা চাকরি করতেন, তিনি নিজের জমিতে নিজের মতো করে একটি বাড়ি নির্মাণ করছেন। বাড়িটি দেখতে সুন্দর হওয়ায় আশপাশের মানুষ সেটিকে স্মার্ট আবাসন মনে করছে। কিন্তু তিনি হয়তো কোনো বিল্ডিং অনুমোদন নেননি, জমিও প্রয়োজনীয়ভাবে ছাড় দেননি। আশপাশে খালি জমি থাকায় বাড়িটিকে দেখতে পরিকল্পিত মনে হচ্ছে। কিন্তু এটি টেকসই নগরায়ণের অংশ নয়। কারণ পাশের জমির মালিক যখন আবার বাড়ি নির্মাণ করবেন, তখন প্রয়োজনীয় জায়গা ছেড়ে দেয়ার সুযোগ থাকবে না।
টেকসই নগরায়ণ করতে হলে আমাদের পরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে যেতে হবে। সেই নগরায়ণে কী থাকবে তা নিয়ে বোঝাপড়া থাকতে হবে। আমি ৩০০ বর্গফুটের বাসায় থাকি নাকি তিন হাজার বর্গফুটের সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং আমার বাসা থেকে কর্মস্থল কত দূরে, আমার সন্তান খেলার মাঠ পাচ্ছে কিনা, সে নিরাপদে স্কুলে যেতে পারছে কিনা, আমার বয়স্ক বাবা-মায়ের হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আছে কিনা, এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এসব বিষয় মাথায় রেখে যদি আমরা আবাসন পরিকল্পনা করি, তাহলে টেকসই নগরায়ণ সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে আমরা সবাই কথা বলছি। কিন্তু ভবিষ্যতের বাংলাদেশটি কেমন দেখতে চাই? অবশ্যই আমরা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সুন্দর দেখতে চাই। আমরা প্রায়ই বিদেশের উদাহরণ দিই—সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা অন্য দেশের কথা বলি। কিন্তু সেসব উদাহরণ আমরা বাংলাদেশে যথাযথ প্রয়োগ করি না। আমরা অনেক কিছু বুঝি, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে নিজের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দিই। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর আবাসন রেখে যেতে হলে এখন থেকেই পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে।
এক্ষেত্রে আমাদের সামনে বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জমির স্বল্পতা। এ সীমিত জমিকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। আমরা বিআইএম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে আবাসন ও নগরায়ণের পরিকল্পনা করতে পারি।
আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু সহনশীলতা। আমাদের দেশ ছোট হলেও একেক অঞ্চলের জলবায়ু ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য একেক রকম। উত্তরবঙ্গে গেলে দেখা যায় খরা, পানির স্বল্পতা, আবার তাপমাত্রার তারতম্য রয়েছে। শীতকালে সেখানে শীত বেশি, আবার গরমের সময় গরমও বেশি। এসব বিষয় মাথায় রেখেই আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। আবার দক্ষিণবঙ্গে গেলে দেখা যায় প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি; সেখানে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও লবণাক্ততার সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যদি আমরা কাজ করি, তাহলেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে পারব।
এ কাজ শুধু সরকার একা করতে পারবে না। অবশ্যই বেসরকারি অংশীজনদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি, ছোট্ট বাংলাদেশকে যদি আমরা স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এটি সম্ভব।
মোসা. ফেরদৌসী বেগম: চেয়ারম্যান, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ
[বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬-এর বক্তব্যে]
