বিনোদন: ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অভিনয়ের সুযোগ পেতে অনেক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মেনে নিয়েছিলেন হলিউড অভিনেত্রী লিনা হেডি। পরে জনপ্রিয় সিরিজ ‘গেম অব থ্রোনস’-এর একটি নগ্ন দৃশ্যে বডি ডাবল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েও দর্শকের সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা, হলিউডের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষায় অভিনেত্রীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেডি জানান, অভিনয়জীবনের শুরুর দিকে কাজ পাওয়াই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চুম্বন, অন্তরঙ্গ দৃশ্য কিংবা নগ্নতার প্রয়োজন রয়েছে—এমন চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে তখন নিজের অস্বস্তি নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন তুলতেন না তিনি।
কাজের সুযোগ পাওয়া এবং শুটিংয়ের অংশ হতে পারার আনন্দে অনেক সময় নিজের অনুভূতি ও সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্ব দেননি বলে জানান অভিনেত্রী। তবে এখন পেছনে ফিরে তাকিয়ে উপলব্ধি করেন, সেই সময়ের সব অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নিজের ব্যক্তিগত সীমারেখা চিহ্নিত করা এবং তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার আত্মবিশ্বাসও কম ছিল বলে জানান হেডি। তাঁর অভিজ্ঞতা বিনোদনশিল্পে কাজের জন্য প্রতিযোগিতা এবং তরুণ অভিনেত্রীদের ওপর তৈরি হওয়া চাপের বিষয়টি সামনে এনেছে।
এইচবিওর জনপ্রিয় সিরিজ ‘গেম অব থ্রোনস’-এ সার্সি ল্যানিস্টার চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান লিনা হেডি। সিরিজটির পঞ্চম মৌসুমের শেষ দিকে সার্সির একটি দৃশ্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই দৃশ্যে চরিত্রটিকে নগ্ন অবস্থায় জনতার সামনে দিয়ে হাঁটতে বাধ্য করা হয়; এ সময় জনতা তাঁকে অপমান ও কটূক্তি করে।
দৃশ্যটিতে হেডির পরিবর্তে বডি ডাবল ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের মাধ্যমে দুই অভিনয়শিল্পীর দৃশ্য একত্র করা হয়।
হেডির ব্যাখ্যা, চরিত্রের আবেগ ও মানসিক অবস্থার গভীরে গিয়ে অভিনয় করতে তিনি পছন্দ করেন। কিন্তু কয়েক দিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে নগ্ন হয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা তাঁর মনোযোগ চরিত্রের অনুভূতির বদলে নিজের অস্বস্তি সামলানোর দিকে সরিয়ে দিতে পারত। এতে সার্সির মানসিক বিপর্যয় বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা কঠিন হতো বলে মনে করেছিলেন তিনি।
সে সময় তিনি দুই সন্তানের মা ছিলেন। নিজের পারিবারিক বাস্তবতাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় এসেছিল।
বডি ডাবল ব্যবহারের অর্থ অবশ্য এই নয় যে দৃশ্যটির অভিনয় থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছিলেন হেডি। শুটিংয়ে অংশ নিয়ে চরিত্রটির আবেগ ও অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে কাজ করেছিলেন তিনি।
২০১৬ সালে ‘এল’ ও ‘এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন অভিনেত্রী। তাঁর আপত্তি ছিল, নগ্ন দৃশ্যে নিজে অভিনয় না করায় কেউ কেউ তাঁকে কম দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
দৃশ্যটিতে বডি ডাবল ব্যবহারের খবর প্রকাশের পর দর্শকের একাংশ সমালোচনা করেন। কেউ কেউ সিদ্ধান্তটিকে দর্শকের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবেও দেখেছিলেন।
দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে হেডি জানান, দর্শকের এমন প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। সিরিজটির বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও অভিনয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও তখন আগের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে।
তবে কোনো দৃশ্যে অভিনয় করবেন কি না, কীভাবে করবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে নিজের সীমারেখা বজায় রাখবেন—এসব বিষয়ে একজন অভিনেত্রীর সিদ্ধান্তের অধিকার রয়েছে। হেডির অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে হলিউডের ক্ষমতার রাজনীতি এবং কাজের সুযোগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও কথা বলেছেন হেডি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
হেডির ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াইনস্টিনের অগ্রহণযোগ্য আচরণের প্রতিবাদ করার পর মিরাম্যাক্সের আর কোনো ছবিতে কাজের সুযোগ পাননি তিনি। তাঁর ধারণা, ওই প্রযোজকের কাছে নতি স্বীকার না করার কারণে পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু কাজের সুযোগ হারিয়েছিলেন।
অভিনেত্রীর মতে, বিনোদনশিল্পে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের প্রভাব এবং কাজের জন্য প্রতিযোগিতায় থাকা তরুণ অভিনেত্রীদের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের অসমতা রয়েছে। একদিকে কাজের সুযোগের প্রয়োজন, অন্যদিকে সেই সুযোগ দেওয়ার ক্ষমতা থাকা ব্যক্তির প্রভাব—এমন পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের প্রতিবাদ করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
২০১৭ সালে #MeToo আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর বিনোদনশিল্পে যৌন হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। হেডির মতে, এই আন্দোলন অনেককে বুঝতে সাহায্য করেছে যে এ ধরনের সমস্যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং শিল্পের বিভিন্ন স্তরে তা বিদ্যমান।
তাঁর পর্যবেক্ষণ, বর্তমান সময়ের অনেক তরুণ অভিনেত্রী নিজেদের ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি সচেতন। অস্বস্তিকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানাতেও তাঁরা এখন বেশি প্রস্তুত।
লিনা হেডির অভিজ্ঞতা অভিনয়শিল্পীদের পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, সম্মতি এবং কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
