সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধ হচ্ছে না। বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত থাকলেও এক শ্রেণির অসাধু জেলের বিরুদ্ধে বিষ প্রয়োগ ও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এতে চিংড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকায়।
অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের বিভিন্ন নদী-খালে রিপকর্ড নামের বিষ প্রয়োগ করে চিংড়ি মাছ শিকার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘন ফাঁসের চরপাতা ও নিষিদ্ধ ভেসালি জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ছোট মাছ ধরা হচ্ছে। সুন্দরবনের ছিচখালি, বুন্দ, কেওড়াসুতি, হংসরাজ, দুধমুখ, দোবেকি, ভোমরখালি, চালকি, মার্কি, আন্দারমানিক, শাপখালি, বাটলু, নোটাবেকি ও কাটেশ্বরসহ বিভিন্ন এলাকার নদী-খালে এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর পশ্চিম সুন্দরবনের ভোমরখালি অভয়ারণ্য এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়রা গ্রামের চার জেলেকে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে চার বোতল বিষ, নিষিদ্ধ ভেসালি জাল, ঘন ফাঁসের চরপাতা জাল, একটি ডিঙি নৌকা, দা ও কুড়াল এবং প্রায় ২০০ কেজি চিংড়ি উদ্ধার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া সুন্দরবনের পশুর নদী, জয়মনি, কচিখালি, হড্ডা, মার্কি, নীলকমল, শাপখালি, বজবজা, আন্দারমানিক ও খাসিটানা এলাকার নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে সম্প্রতি আরও ২০ জেলেকে আটক করা হয়েছে বলে বন বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ও ফরেস্ট রেঞ্জার আলামিন হোসেন জানান, অভিযানে বিষ, নিষিদ্ধ জাল ও মাছ শিকারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাসানুর রহমান বলেন, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা করা হয়েছে।
পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করা হলে লক্ষ্যবস্তু মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষাক্ত পদার্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়লে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে দূষিত মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগের ঘটনা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, নিষিদ্ধ জাল জব্দ এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগের অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন।
সুন্দরবন উপকূলের বহু মানুষের জীবিকা মাছ আহরণ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জীবিকার সংকটে পড়তে পারেন বননির্ভর জেলে ও উপকূলের সাধারণ মানুষ। সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি বন্ধ করা জরুরি।