অনলাইন ডেস্ক
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। তবে অধিবেশনের শুরুতেই রাজনৈতিক উত্তাপ দেখা দিতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ও অবস্থান থেকে।
আজ সকাল ১১টায় রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন-এর সংসদ কক্ষে অধিবেশন শুরু হবে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তবে তাঁর ভাষণকে ঘিরেই শুরুতেই বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কারণ, বর্তমান রাষ্ট্রপতি আগের সরকারের আমলে নির্বাচিত হওয়ায় বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ তাঁর ভাষণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান গতকাল সংসদের এলডি হলে সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে তাঁদের দলের অবস্থান অধিবেশনের দিনই স্পষ্ট হবে।
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর অধীনে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিতর্ক তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে এ সনদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জুলাই সনদের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে নিজস্ব অবস্থান থেকে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চায়। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি গণভোটে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল। তবে বিএনপি সেই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এখনো পরিষদটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।
প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা।
সংসদে বিএনপির দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি চাইলে নিজস্ব প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে সংসদে ও সংসদের বাইরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রথম দিনের অধিবেশন কিছুটা ব্যতিক্রমীভাবে শুরু হবে। কারণ বিদায়ী সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এ কারণে স্পিকারের আসন খালি রেখেই অধিবেশন শুরু হবে। প্রথমে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হবে। এরপর সংসদ নেতা একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন, যিনি সাময়িকভাবে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন।
পরে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এরপর শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করা হবে।
শোক প্রস্তাব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩৫০টি, যার মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন। তবে এই আসনগুলোর নির্বাচন এখনো হয়নি। সাধারণ ৩০০ আসনের মধ্যে এবারের নির্বাচনে ভোট হয়েছে ২৯৯টিতে।
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এছাড়া সংসদে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিসহ মোট নয়টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই অনুষ্ঠিত হয় এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর একটি নতুন বাস্তবতায় শুরু হতে যাওয়া এই সংসদে কার্যকর বিতর্ক, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন প্রত্যাশাই করছে দেশের মানুষ।
