Published on
:
3 min read
এই সময়: থানায় গিয়ে সারেন্ডার করার আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় খোলা চিঠি লিখলেন চোরবাগানে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত এক ঘোষক। সেই চিঠি–ই তদন্তের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। এরপরেই অবশ্য অভিযুক্ত কুশল মজুমদার নিজেই গিরিশ পার্ক থানায় গিয়ে ধরা দেন।
প্রথম সপ্তমীর রাতে চোরবাগানের পুজো দেখতে গিয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর কারণ খোঁজার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত সিট এবং লালবাজার কাজ শুরু করেছে। ঠিক সে সময়ে পুজোর অন্যতম ঘোষক কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়ার সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। শুক্রবার বেলা বারোটায় যখন ওই চিঠি পোস্ট করা হয় সে সময়ে কুশল নিজেই গিরিশ পার্ক থানায় সারেন্ডার করার জন্য হাজির হয়েছিলেন। পুলিশ থানা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
শুক্রবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের পোস্ট থেকে কুশল এক পুলিশকর্মী এবং পুজো কমিটির এক কর্তার ছেলের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন। ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি লেখেন,‘পরিকল্পনা করে আমাদের বিপদে ফেলা হয়েছে। পিছনে কে আছে, খোঁজ নেওয়া দরকার।’ এরপর এলাকার বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও সামনে আনেন তিনি।
থানায় কুশল, পোস্ট কার?
কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়া ওরফে বাবু গত ২০ বছর ধরে চোরবাগান ক্লাবের সদস্য বলে এ দিন দাবি করেছেন। সূত্রের খবর, গিরিশ পার্ক থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করার আগে একই বক্তব্য ফেসবুকে লাইভ করে জানান তিনি। অদ্ভুত ভাবে এ দিন দুপুরে কুশলের চিঠি পোস্ট হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর ফেসবুক লাইভটিও ডিলিট হয়ে যায়।
তবে শুক্রবার তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা চিঠি তিনি লিখেছেন, নাকি তাঁর হয়ে অন্য কেউ পোস্ট করেছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছে পুলিশও। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমি ক্লাবের সকল সদস্যদের হয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইছি।’
এর পর, ঘটনার বিবরণ দেন কুশল। তিনি লেখেন, ‘ওই সময়ে গিরিশ পার্ক থানার ‘বড় বাবু এবং ছোট বাবু’ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা চা খাবেন বলায় আমি এবং ক্লাবের সহ–সভাপতি শান্তনু দুবে তা আনতে যাই। ফেরার পথে বৃষ্টি শুরু হলে দর্শকরা হুড়মুড়িয়ে দৌড়তে শুরু করেন। তখনই আমাদের কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা (সেন্টু) ঘোষণা করেন, ‘তাড়াহুড়ো করবেন না। বিপদ হতে পারে।’
এর পর কী হয়েছিল? কুশলের দাবি, ‘১০-১৫ মিনিট পরে একটি শব্দ শুনতে পাই। সে সময়ে থানার বড় বাবু এবং ছোট বাবু ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে যান। ক্লাবের সম্পাদক রাজকুমার সেওদার ছেলে কবির এসে বলে, ‘মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে’। ওই সময়ে আমিও বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন পুলিশের একজন বলেন, ‘আপনারা মাইকে ঘোষণা করুন।’ আমি সামনে গিয়ে দেখি, যিনি ঘোষক ছিলেন, তিনি ওখানে নেই। বাধ্য হয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও মাইকে সাবধান করি।’
ধৃতের দাবি, প্রথমে পুলিশকে দিয়ে মণ্ডপে ঢোকার মূল রাস্তা বন্ধ করিয়ে দেন তিনি। কী করতে হবে, তাও ঘোষণা করেন। তাঁর কথায়, ‘যেহেতু কবির বলেছিল, মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে গিয়েছে, তাই আমি বলি, ‘আপনারা মণ্ডপে প্রবেশ করবেন না। মূল মণ্ডপের অবস্থা খুব খারাপ। এত দর্শক একসঙ্গে প্রবেশ করলে মণ্ডপের ভিত আলগা হয়ে ভেঙে পড়তে পারে।’ ব্যাখ্যা দিয়ে চিঠির শেষে তিনি লেখেন, ‘এতে আমার কোনও খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। মাইকের মুখ মণ্ডপের ভিতরে বা মাঠের দিকে ছিল না। সেটা ছিল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট, অমর বসু সরণি এবং পার্বতী ঘোষ লেনের দিকে।’ তবে এলাকায় খোঁজ করে কবিরকে পাওয়া যায়নি।
এ দিকে, কুশলের স্ত্রী কোয়েল মজুমদার সংবাদ মাধ্যমে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ বিপদে পড়ায় তাঁদের সাহায্য করার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তার পর থেকে আর ফেরেনি। ও আমাকে বলেছিল ‘আমি থানায় যেতে চাইছি। কিন্তু, আমাকে কেউ বারণ করে বলছে ২৭ তারিখের আগে থানায় যাস না।’ এখানেই সন্দেহ বেড়েছে পুলিশ কর্তাদের। তাঁরা জানতে চাইছেন, কে কুশলকে ২৭ তারিখের পরে থানায় যেতে নির্দেশ দিয়েছিল।
সিটের নজরে পুলিশও
হাইকোর্টের নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে সিট ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। ওই দলের সদস্যরা পুজো মণ্ডপ পরিদর্শনের পাশাপাশি কমিটির কর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছেন। গতবারের থেকে কম সংখ্যায় পুলিশ ছিল কি না, সমন্বয় ঠিক ছিল কি না, সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্রের খবর, গত বার যে অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসাররা ডিউটিতে ছিলেন, এ বার সেই সংখ্যাও কম ছিল বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়দেরই একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, ‘গত কয়েক বছরে পুজোয় অনেক পুলিশ, সিভিক ভলান্টিয়ার, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীকে দেখা গিয়েছিল। এ বার তেমন কিছু চোখে পড়েনি।’
সিট–এর পাশাপাশি লালবাজারও বিপর্যয়ের কারণ খঁুজছে। জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ৫০ জনের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। যাদের মধ্যে ঘটনাস্থলে ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশের বেশ কয়েকজন হোমগার্ড, স্বেচ্ছাসেবক, বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন।
এ দিন আদালতে পেশ করা হলে নদিয়া থেকে ধৃত ঘোষক সঞ্জীব রাহাকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। এ দিকে, চোরবাগানের প্রতিমা নিরঞ্জনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। ২৪ অথবা ২৫ অক্টোবর প্রতিমা নিরঞ্জন হতে পারে বলে সূত্রের খবর। সিট–এর অনুমতির পরে প্রতিমা বের করার জন্য প্রবেশপথের উচ্চতাও বাড়ানো হচ্ছে।
