…………………….মো. মামুন হাসান………………….
গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় তুপতুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। সেই আগুনে দশজন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে নারী ও একটি পাঁচ বছরের শিশুও রয়েছে। সমুদ্রের ধারে বেড়াতে এসে যাঁরা সকালের নাশতার অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের আর ঘরে ফেরা হলো না। একজন শিক্ষক এবং পর্যটন বিষয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করা মানুষ হিসেবে এই মৃত্যুগুলোকে আমি কেবল দুর্ঘটনা বলতে পারছি না। এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার করুণ পরিণতি।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনতলা রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল কাঠ, বাঁশ ও কাঠের পাটাতন দিয়ে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সেফটি সনদ ছিল না এবং জুন মাসেই এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না, আর একমাত্র কাঠের সিঁড়িটি ছিল রান্নাঘর ও জেনারেটর কক্ষের মাঝখানে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুন লাগার সন্দেহ করা হচ্ছে, যদিও প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করবে তদন্ত কমিটি। কারণ যা ই হোক, যেখানে আগুন লাগলে পালানোর পথই থাকে না, সেখানে একটি সামান্য চুলার আগুনও গণহত্যার রূপ নিতে পারে।
আরেকটি তথ্য আমাদের ভাবনার গভীরে নাড়া দেওয়ার মতো। ঘটনাস্থল থেকে সবচেয়ে কাছের ফায়ার স্টেশন ছিল প্রায় বাইশ কিলোমিটার দূরে। কক্সবাজারে পাঁচশোর বেশি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট আছে, যার অনেকগুলোই বাধ্যতামূলক ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া চলছে বলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ ঝুঁকির কথা সবাই জানত, শুধু তা দূর করার দায়িত্ব কেউ নেয়নি।
বিদেশি পর্যটকের চোখে আমরা
এ ধরনের খবর আজ আর সীমানার ভেতরে আটকে থাকে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে ঘটনাটি প্রকাশ করেছে। একজন সম্ভাব্য বিদেশি পর্যটক যখন গন্তব্য বাছাই করেন, তখন তিনি আগে খোঁজেন নিরাপত্তার কথা। তাঁর সামনে যদি বারবার ভেসে ওঠে যে বাংলাদেশের বিখ্যাত সমুদ্রসৈকতে অনুমোদনহীন কাঠের রিসোর্টে আগুন লেগে দশজন পর্যটক মারা গেছে, তাহলে তিনি অন্য দেশের টিকিট কাটবেন, এটাই স্বাভাবিক। একটি দেশের পর্যটন সুনাম গড়তে বছরের পর বছর লাগে, কিন্তু তা নষ্ট হতে লাগে কয়েকটি শিরোনাম।
আমাদের তো এমনিতেই আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, পাহাড়ি জনপদ, চা বাগান, সেন্ট মার্টিনের প্রবালদ্বীপ, এত কিছু থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা অতিথির জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারি, তাহলে এসব সম্পদ কেবল ছবির বিজ্ঞাপন হয়েই থাকবে।
সমাধান কোথায়
শোক প্রকাশ আর তদন্ত কমিটি গঠনের পরিচিত চক্র থেকে এবার বেরিয়ে আসা দরকার। আমার বিবেচনায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, কক্সবাজারসহ সব পর্যটন এলাকার প্রতিটি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের জন্য একটি সময়বদ্ধ জরুরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা চালাতে হবে। ফায়ার লাইসেন্স, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ধোঁয়া শনাক্তকরণ সতর্ক সংকেত ও বৈদ্যুতিক লাইনের মান পরীক্ষা করতে হবে। যারা শর্ত পূরণ করবে না, সংশোধনের নির্দিষ্ট সময় দিয়ে তাদের ব্যবসা স্থগিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করার পর কী হবে, সেটা নির্ধারণ করতে হবে। জুন মাসে চিহ্নিত হওয়া একটি প্রতিষ্ঠান অক্টোবরেও পর্যটকদের কাছে ঘর ভাড়া দিচ্ছে, এটি আমাদের প্রয়োগ ব্যবস্থার দুর্বলতারই প্রমাণ। চিহ্নিতকরণের পর নোটিশ, জরিমানা ও প্রয়োজনে সিলগালার স্পষ্ট ও দ্রুত প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, দায়িত্ব ভাগাভাগির জট খুলতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পর্যটন সংস্থাগুলোর কাজ আলাদা, কিন্তু পর্যটকের নিরাপত্তা একটি সমন্বিত দায়িত্ব। একটি একক সমন্বয় কেন্দ্র বা ট্যুরিস্ট সেফটি অথরিটি থাকলে কে কী করবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা কমবে।
চতুর্থত, ইনানী, মেরিন ড্রাইভ ও টেকনাফ অঞ্চলের মতো দূরবর্তী পর্যটন এলাকায় নতুন ফায়ার স্টেশন ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাইশ কিলোমিটার দূর থেকে আগুন নেভাতে আসা কোনো দলের পক্ষে কাঠের ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব।
পঞ্চমত, নির্মাণ নীতিমালা কঠোর করতে হবে। সৈকত ঘেঁষা এলাকায় কাঠ ও বাঁশের মতো দাহ্য উপকরণে বহুতল ভবন বানিয়ে পর্যটকদের থাকতে দেওয়া বন্ধ করা উচিত। ইকো রিসোর্টের নামে যেন মৃত্যুফাঁদ তৈরি না হয়, সে জন্য নকশা অনুমোদনের সময়ই অগ্নি নিরাপত্তা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ষষ্ঠত, হোটেল ও রিসোর্টের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দরকার। আমার বিভাগের শিক্ষার্থীরা হসপিটালিটি পেশায় কাজ করতে গিয়ে প্রথম দিনেই শেখে, অতিথির নিরাপত্তা সবার আগে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চালাতে জানেন না, অতিথিদের কীভাবে সরিয়ে নিতে হয় তা-ও জানেন না। নিয়মিত মহড়া ও সনদ বাধ্যতামূলক করা গেলে এ অবস্থা বদলাতে পারে।
সপ্তমত, পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে। ঘর নেওয়ার আগে বহির্গমন পথ কোথায় তা দেখে নেওয়া, ভবনটি কেমন উপকরণে তৈরি তা লক্ষ করা, এই ছোট অভ্যাসগুলো জীবন বাঁচাতে পারে। সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও নিরীক্ষিত হোটেলের তালিকা প্রকাশ করলে পর্যটকরা নিরাপদ বিকল্প বেছে নিতে পারবেন।
অষ্টমত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দ্রুত ডিএনএ শনাক্তকরণ, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা এই দায়ের অংশ। দায়ীদের বিচার হলে তবেই বাকি ব্যবসায়ীরা বুঝবেন যে নিয়ম অমান্য করার মূল্য আছে।
শেষ কথা
পর্যটন কেবল রাজস্ব বা কর্মসংস্থানের খাত নয়, এটি একটি দেশের প্রতি অতিথির আস্থার সম্পর্ক। সেই আস্থা তৈরি হয় যখন একজন অতিথি জানেন, ঘুম থেকে জেগে ওঠার নিশ্চয়তা তাঁর আছে। ইনানীর এই দশটি প্রাণ আমাদের সেই আস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক সপ্তাহ আলোচনার পর ঘটনাটি ভুলে যাব, নাকি এটিকেই নিরাপদ পর্যটনের নতুন শুরু বানাব? যে মায়েরা, শিশুরা আর পরিবারগুলো এই আগুনে হারিয়ে গেলেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে আর কোনো পর্যটককে সমুদ্র দেখতে এসে প্রাণ দিতে না হয়।
লেখক: মো. মামুন হাসান, শিক্ষক ও পর্যটন উন্নয়ন গবেষক ।
( মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব )
