মানিক পশারীর জানাজা বা দাফনে কোনো বাধা ছিল না, তবে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও সরকারি ভাতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তদন্ত এবং জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছেন মাসুদ সাঈদী।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী বলেছেন, মানিক পশারীর লাশ দাফন বা জানাজায় কোনো বাধা ছিল না। জনগণের আপত্তি ছিল একজন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে’ গার্ড অব অনার প্রদান নিয়ে, যা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

পোস্টে মাসুদ সাঈদী লেখেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পোষ্য ও সুবিধাভোগী দালাল কুখ্যাত মানিক পসারী আজ দিনের কোনো একসময় গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুর পর তাকে পিরোজপুরে আনা হয় এবং তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের চেষ্টা করা হয়।
তিনি লেখেন, জনগণ বিষয়টি জানতে পেরে তাকে কথিত ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানে বাধা দেয় এবং মানিক পশারী যে মুক্তিযোদ্ধা নন, তা প্রশাসনকে অবহিত করে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি ‘গেজেটপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা’। এরপরও জনগণ একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদানে বাধা দেয়।
মাসুদ সাঈদী আরও লেখেন, “আমরা জনগণকে শান্ত করেছি, ধৈর্য ধারণ করতে বলেছি। অতীতে আওয়ামী লীগ যেসব অন্যায় করেছে, সেসব অন্যায় কোনোভাবেই যেন আমাদের দ্বারা না হয়, সে বিষয়ে জনগণকে বুঝিয়েছি। আমি বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি (বরিশাল রেঞ্জ) থেকে শুরু করে পিরোজপুর প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলগত অবস্থান থেকে উভয়ে একযোগে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বরাবরই নিয়ন্ত্রণে ছিল, তবে জনগণের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ সত্যিই খুব কঠিন ছিল।”
তিনি বলেন, মানিক পশারীর জানাজা বা দাফন নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য বা বাধা ছিল না, নেইও। আপত্তি ছিল একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান নিয়ে। যদিও প্রশাসন মিথ্যাচার ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাপ্ত একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে।
মাসুদ সাঈদী লেখেন, “অবশ্যই ঘটনাটি এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের অপমান ও মহান স্বাধীনতার অবমাননা এবং দেশের আইনি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি চরম এক উপহাস বলে মনে করছি। যে ব্যক্তি স্বয়ং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেরায় স্বীকার করেছেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন—সেই রকম প্রতারক ব্যক্তিকে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া এবং বছরের পর বছর সরকারি ভাতা ভোগ করতে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও ডিও লেটার জালিয়াতি
পোস্টে মাসুদ সাঈদী উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানিক পশারীকে আইনজীবী প্রশ্ন করেন, ‘আপনি মুক্তিযোদ্ধা কি না?’ জবাবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করিনি।’
ট্রাইব্যুনালে মানিক পশারীর বক্তব্য হুবহু তুলে ধরে মাসুদ সাঈদী লেখেন, “আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই, তবে সহযোগিতা করেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। এই জন্য বর্তমান এমপি এ,কে,এম,এ, আওয়াল সাহেব আমার নামে একটি ডিও লেটার দিয়েছে আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জন্য। আমি পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করার পরে না আগে আমার ঐ ডিও লেটার দিয়েছে তা আমার স্মরন নাই।”
মাসুদ সাঈদী লেখেন, এখানে মানিক পশারী অকপটে স্বীকার করেছেন যে তিনি কোনো মুক্তিযোদ্ধা নন। তবে এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আসার আগে তৎকালীন আওয়ামী দোসর কুখ্যাত এমপি আউয়াল তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য একটি ডিও (Demiofficial) লেটার দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, স্রেফ মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল।
মাসুদ সাঈদীর চারটি দাবি ও প্রশ্ন
পোস্টে মাসুদ সাঈদী চারটি দাবি ও প্রশ্ন তুলে ধরেন।
১. তিনি লেখেন, “একটি দেশের সর্বোচ্চ বীরত্ব ও সম্মানের জায়গা হলো ‘মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাব। মানিক পশারীর মতো একজন কুখ্যাত ও স্বঘোষিত অ-মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রমাণিত মিথ্যাবাদীকে কারা গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বানাল? কোন কুচক্রী মহল তাকে রাষ্ট্রের করের টাকায় বছরের পর বছর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার সুযোগ করে দিল?”
২. মানিক পসারীকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাকে অবৈধভাবে ভাতা পাইয়ে দেওয়ার পেছনে যেসব কর্মকর্তা, যাচাই-বাছাই কমিটি ও রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. একজন ভুয়া ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন করে ডিও লেটার দেওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্যের বিনিময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম ওঠানোর অপরাধে সাবেক অবৈধ এমপি একেএমএ আউয়ালের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. একই সঙ্গে মানিক পশারীর নাম অবিলম্বে মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট থেকে বাতিল করতে হবে এবং তাকে দেওয়া সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও ভাতা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি
পোস্টের শেষাংশে মাসুদ সাঈদী লেখেন, “মিথ্যা ও জালিয়াতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো অপশক্তি চিরদিন সত্যকে ধামাচাপা দিতে পারে না। মানিক পসারী ও তার পৃষ্ঠপোষকদের এই জালিয়াতি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলঙ্কিত করেছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
