জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর মালিকানা-সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করতে নামজারি করা জরুরি। জমির মালিকানা সুনির্দিষ্ট করা এবং ভবিষ্যতে জটিলতা এড়াতে এই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। সম্প্রতি নামজারির নিয়মে কিছু পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারির বিধান করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথভাবে নামজারি করতে হবে। তবে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে জমি ভাগ করা হলে ওয়ারিশরা নিজেদের অংশ অনুযায়ী পৃথক খতিয়ান করতে পারবেন।
নতুন নিয়মে যেসব পরিবর্তন
সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে: আগে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে কোনো কোনো ওয়ারিশ অন্যদের বাদ দিয়ে নিজের নামে আলাদা নামজারি করিয়ে নিতে পারতেন। নতুন নিয়মে মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথভাবে নামজারি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেককে সহ-অংশীদার বা কো-শেয়ারার হিসেবে দেখানো হবে।
বণ্টননামা না থাকলেও যৌথ নামজারি: জমির আনুষ্ঠানিক বণ্টন না হলে পৃথক খতিয়ান করা যাবে না। তবে শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, এ বিধানের ফলে অন্য ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে জমি নিজের নামে নেওয়ার সুযোগ কমবে।
ওয়ারিশ সনদ বাধ্যতামূলক: নামজারির আবেদনের সঙ্গে সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে হবে। কোনো ওয়ারিশের তথ্য বাদ পড়লে আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে।
পৃথক খতিয়ান করার নিয়ম: ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নিতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে। এরপর বণ্টন অনুযায়ী প্রত্যেকে নিজের অংশের জন্য পৃথক নামজারি ও খতিয়ানের আবেদন করতে পারবেন।
নামজারি করতে যেসব কাগজপত্র লাগবে
জমির ধরন ও মালিকানা অর্জনের পদ্ধতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণত নামজারির আবেদনে প্রয়োজন হয়—
১. জমি কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের কপি।
২. আগের খতিয়ানের কপি।
৩. জমির দাগ নম্বর ও প্রয়োজনীয় বিবরণ।
৪. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।
৫. উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মৃত্যুসনদ।
৬. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা।
৭. নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধের তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি।
আবেদনের আগে সব কাগজপত্রের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ বা মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্যে অসংগতি থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে।
অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে
নামজারির আবেদন অনলাইনে করা যায়। এ জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি সেবা ব্যবহার করতে হবে।
প্রথম ধাপ: ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। ই-নামজারি সেবার জন্য land.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সেবার লিংক নির্বাচন করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুসরণ করে আবেদনপ্রক্রিয়া শুরু করুন। আবেদনকারীর পরিচয়, জমির অবস্থান, খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং মালিকানা অর্জনের বিবরণ সঠিকভাবে পূরণ করুন।
তৃতীয় ধাপ: জমি কেনা নাকি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া—তা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য দিন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করুন।
চতুর্থ ধাপ: প্রয়োজনীয় দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদসহ প্রযোজ্য কাগজপত্র নির্দেশনা অনুযায়ী সংযুক্ত করুন।
পঞ্চম ধাপ: আবেদন জমা দিয়ে নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করুন। আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া আবেদন নম্বর বা ট্র্যাকিং তথ্য সংরক্ষণ করুন।
ষষ্ঠ ধাপ: অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি অনুসরণ করুন। ভূমি অফিস থেকে অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাওয়া হলে তা নির্ধারিত নিয়মে জমা দিন।
আবেদনের আগে সরকারি পোর্টালে দেওয়া সর্বশেষ নির্দেশনা ও ফি যাচাই করে নেওয়া উচিত। জমির ধরন, কাগজপত্র এবং কোনো আপত্তি রয়েছে কি না, তার ওপর নিষ্পত্তির সময় নির্ভর করতে পারে।
নামজারি না করলে কী সমস্যা হতে পারে?
জমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ না করলে মালিকানা-সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, জমি হস্তান্তর এবং মালিকানা যাচাইয়ের সময় সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এ ছাড়া জমি নিয়ে বিরোধ বা প্রতারণার আশঙ্কা দেখা দিলে সঠিক ও হালনাগাদ নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে নামজারি নিজে জমির চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণের একমাত্র প্রমাণ নয়। জমির দলিল, উত্তরাধিকার, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও গুরুত্বপূর্ণ।