Published on
:
2 min read
চাঁদকুমার বড়াল, কোচবিহার
সময়ের স্রোত বয়ে গিয়েছে পাঁচশো বছরেরও বেশি। বদলেছে রাজ্যপাট, বদলেছে সময়ও। কিন্তু আজও অটুট কোচবিহারের বড় দেবীর পুজোর ঐতিহ্য। দুর্গা এখানে ‘বড় দেবী’ নামেই পরিচিত। মহারাজা বিশ্ব সিংহের আমলে এই পুজোর প্রচলন হয়েছিল বলে কথিত রয়েছে। রাজ আমলের বহু প্রাচীন রীতি মেনে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে হয় দেবীর আরাধনা।
বড় দেবীর প্রতিমার গঠন ও রূপও অন্যান্য দুর্গাপ্রতিমার তুলনায় আলাদা। দেবীর গায়ের রং অনেকটাই লাল, মূর্তির আকারও বেশ বড়। মহিষাসুরের ডান হাতে সিংহ এবং বাম হাতে বাঘ কামড়ে রয়েছে। দেবীর দু’পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পরিবর্তে থাকেন জয়া ও বিজয়া। বর্তমানে কোচবিহার দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ড এই পুজোর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।
সময়টা ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে। কথিত রয়েছে, ছোটবেলায় মহারাজা বিশ্বসিংহ বিশু নামে পরিচিত ছিলেন। এক দিন মহারাজা বিশ্বসিংহ, তাঁর চার ভাই-সহ কয়েকজন বালক একটি নির্জন জায়গায় খেলছিলেন। সেই সময়ে বিশ্বসিংহের বয়স ৯ বছর। খেলা করতে করতেই শুকনো বাঁশের কঞ্চি ও ময়না গাছের ডাল একসঙ্গে পুঁতে তাঁরা এক দেবীর রূপ কল্পনা করে পুজো শুরু করেন। সেই সময় নাবালক বিশ্বসিংহ কুশের খড়া দিয়ে তৈরি একটি বালকের মূর্তি তৈরি করে তাকে বলি দেওয়ার জন্য আঘাত করলে শিরচ্ছেদ হয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। ভয়ে অন্য বালকেরা পালিয়ে যান। বিশ্বসিংহও বনের পথে চলতে চলতে একটি গাছের তলায় বসে ঘুমিয়ে পড়েন।
তখন স্বপ্নে দেবী তাঁকে জানান, তিনি পুজোয় সন্তুষ্ট হয়েছেন, ভয়ের কোনও কারণ নেই। দেবী আরও জানান, ময়নাকাঠ ও বাঁশের কঞ্চিতে নতুন পাতা গজিয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই বড়দেবীর পুজোয় ময়নাকাঠকে দেবীর মূল কাঠামো হিসেবে ব্যবহারের প্রথা চালু হয়, যা আজও বজায় রয়েছে।
এই পুজোর আরেকটি বিশেষত্ব অষ্টমী তিথির মহানিশা মুহূর্তে অনুষ্ঠিত গুপ্তপুজো। রাজ আমলে এই পুজোয় নরবলির প্রচলন ছিল বলে কথিত রয়েছে। বর্তমানে নরবলি বন্ধ হলেও প্রথা মেনে চালের গুঁড়ো দিয়ে একটি মূর্তি তৈরি করা হয়। বংশপরম্পরায় পরিবারের সদস্যরা সেই মূর্তির উপর আঙুল কেটে রক্ত দেন। পরে ওই মূর্তিই দেবীর সামনে বলি হিসেবে নিবেদন করা হয়।
রাজপুরোহিত হীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন, ‘রাজ আমলের সমস্ত নিয়ম আজও মেনে চলা হচ্ছে। রীতি অনুযায়ী, রাধাষ্টমীর দিন মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি থেকে ময়নাকাঠ নিয়ে আসা হয় মন্দিরে। ময়নাকাঠের মহাস্নান ও বিশেষ পুজোর পর সেটিকে একটি ট্রলির উপর তোলা হয়। এরপর নাটাবাড়ির চামটা থেকে আনা মাটি ও খড় দিয়ে সেই ময়নাকাঠের উপর বড়দেবীর প্রতিমা তৈরির কাজ করা হয়েছে এ বারও। এই রীতি প্রতি বছর অনুসরণ করা হয় পরম্পরা অনুযায়ী।’
