ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে জেরুজালেমে নিজেদের কনস্যুলেট জেনারেলকে ‘ইউকে মিশন, জেরুজালেম’ নামে চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। তবে নতুন সমঝোতার পর সেখানে ব্রিটিশ কূটনীতিকদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় সেবা কতটা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলের সঙ্গে বিরোধের জেরে জেরুজালেমে ব্রিটিশ কূটনৈতিক মিশনের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ সরকার মিশনটি সচল রাখার কথা বললেও ইসরাইলের পক্ষ থেকে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে বাস্তবিক কী ধরনের সুযোগ থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিজ্ঞাপন
বসতি নীতি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত
গত ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি সহিংসতায় জড়িত বা উসকানি দেওয়া উগ্রপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং আরো বিস্তৃত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ব্রিটেনের মতে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে মিলিব্যান্ড জাতিগত নিধনের অভিযোগও তোলেন। তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
এই ঘোষণার পরই ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেয় ইসরাইল। একই সঙ্গে রামাল্লা ও গাজাবিষয়ক সমন্বয়কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্রিটেনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ করা এবং ১২ জন ব্রিটিশ ব্যক্তিত্বের ইসরাইলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েন ১১ জন ব্রিটিশ সংসদ সদস্যও।
২৭ কূটনীতিকের মধ্যে থাকছেন মাত্র সাতজন
গত ৮ অক্টোবর ইসরাইলের দেওয়া কনস্যুলেট বন্ধের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়। এর ফলে ভবনটি পুরোপুরি বন্ধ না করে নতুন নামে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার জানিয়েছেন, কনস্যুলেটে কর্মরত ২৭ জন কূটনীতিকের মধ্যে ২০ জনকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তাদের মধ্যে কনসাল জেনারেলও রয়েছেন। বাকি সাতজন সীমিত পরিসরে কাজ করবেন।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকারের বিবৃতিতে সুনির্দিষ্ট কর্মীসংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার কারণে কয়েকজন কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ইসরাইল সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলাকালে তারা পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেবে না। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জেরুজালেমে কূটনৈতিক উপস্থিতি পুনরায় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্রিটেন কনস্যুলেট বন্ধ করার ক্ষেত্রে ইসরাইলের আইনগত অধিকারও স্বীকার করেনি। দেশটির বক্তব্য, পূর্ব জেরুজালেম অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং সেখানে ব্রিটিশ কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে তারা সরে আসেনি।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?
জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেটের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। ১৮৩৮ সালে এর কার্যক্রমের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে ব্রিটেনের রাজনৈতিক যোগাযোগ, পশ্চিম তীর ও গাজায় উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ওই অঞ্চলে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের কনস্যুলার সেবা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
কনস্যুলেটটি তেল আবিবে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসের অধীন নয়; বরং সরাসরি লন্ডনের কাছে বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্রিটেনের স্বতন্ত্র যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এসেছে।
কিন্তু নতুন সমঝোতার পর অবশিষ্ট কূটনীতিকেরা ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত এবং উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনায় কী ধরনের বিধিনিষেধের মুখে পড়বেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। স্থানীয়ভাবে নিয়োগ করা কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনীতিকদের সংখ্যা কমে যাওয়া শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ব্রিটেনের সরাসরি যোগাযোগের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েও চাপে ব্রিটেন
২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাজ্য। এর আগে ও পরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি ব্রিটিশ রাজনীতিতে গুরুত্ব পায়।
২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি লন্ডনে ফিলিস্তিনের মিশনকে দূতাবাসে উন্নীত করা হয়। এর বিপরীতে জেরুজালেমে ব্রিটেনের কূটনৈতিক কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ এখনো ইসরাইলের অনুমোদন ও বিধিনিষেধের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোকেও ইসরাইলের পাল্টা পদক্ষেপের মুখে পড়তে হয়েছে। ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর স্পেনের জেরুজালেম কনস্যুলেটকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের কনস্যুলার সেবা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বসতিসংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার উদ্যোগের পর নেদারল্যান্ডসের কূটনীতিকদের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের হুমকিও দেয় ইসরাইল।
এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার অঙ্গীকার করছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার ক্ষেত্রে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের মুখোমুখি হচ্ছে।
ব্রিটেনের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চায়
ব্রিটিশ সরকারের উচিত নতুন সমঝোতার পর জেরুজালেম মিশন ঠিক কী কী কাজ করতে পারবে, তা স্পষ্ট করা। পাশাপাশি কূটনীতিকদের কীভাবে পুনরায় সেখানে পাঠানো হবে এবং ইসরাইল তাদের কাজে বাধা দিলে লন্ডন কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়েও পরিষ্কার অবস্থান জানানো প্রয়োজন।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর মিশনটির কার্যক্রম পুনরায় সম্প্রসারণের আশ্বাস দিলেও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি। ফলে জেরুজালেমে ব্রিটিশ মিশন আপাতত চালু থাকলেও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এই সমঝোতা ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
