২০২২ সালের মাঝামাঝি কোনো এক বৃষ্টির মৌসুম। ১৫-১৬ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে ভিড়ল এক নৌকা। তখনো বিকেল মিলিয়ে গোধূলি আসেনি; বর্ষার মৌসুমে ফুলে-ফেঁপে ওঠা হাওরে শেষ বিকেলের আলো যেন ছড়িয়ে দিয়েছে নিযুত স্বর্ণরেণু। কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, বাতাসে এখন তারই জলজ গন্ধ। আর যে পেঁজা একটুকরো মেঘ ওই বৃষ্টি নামিয়েছিল, সে তার শেষটুকু নিয়ে ভেসে যাচ্ছে দূর পাহাড়ের সানুদেশে। ভেজা মেঘ ভেসে যাওয়ার অলৌকিক ওই দৃশ্য আনমনা হয়ে দেখছেন দুই তরুণ। নৌকার ছাদে আর গলুইয়ে বসে তাঁরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন কাঁটাতারের ওপারে; পাহাড়ের পানে। টাঙ্গুয়ার জলরাশির সৌন্দর্য ছাপিয়ে তাঁদের দুজনের মনেই বাসা বেঁধেছে প্রশ্ন—ওই মেঘের জন্ম কোথায়? কী আছে পাহাড়ের ওপাশে?
সন্ধ্যা নামার পর একে একে জ্বলে উঠল সীমান্তের আলো, দেখে মনে হলো দেয়ালের শরীরে শত ছেঁড়া রং। নৌকার ছাদে শুয়ে অনন্ত নক্ষত্রবীথি গুনতে গুনতে সে আলো এসে লাগল তরুণদ্বয়ের, মানে আমাদের চোখে। দিনের বেলায় যা ছিল শুধু দূরের দৃশ্য, রাতের আলোয় তা যেন হয়ে উঠল অতি নিকটবর্তী। ওপারে আভাস পাওয়া গেল মানুষ চলাচলেরও। কেউ হয়তো ঘরে ফিরছে, কারও রাত শুরু হয়েছে। আমাদের দিক থেকে দেখলে শুধু কয়েকটি আলো। আবারও মনে হলো, ওপারের আলো ছাপিয়ে কখনো কি যেতে পারব দূর পাহাড়ের গায়ে?

অবশেষে সুযোগ পাওয়া গেল ২০২৩ সালে। সেবারই প্রথম মেঘালয়ে আসা। তারপর আবার। এবারও। তবে এ আলাপ আমাদের প্রথম বা দ্বিতীয়বারের মেঘালয় ভ্রমণ নিয়ে নয়। এ আলাপ আমাদের এবারের মেঘালয়কে চেনা নিয়ে, নিজেদের খোঁজার এক অন্তহীন যাত্রাকে নিয়ে।
ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের বেড়াজাল ডিঙিয়ে আমরা এবার যখন ডাউকিতে পা রাখলাম, ছোটখাটো আর হাসিখুশি চেহারার নেপালি যুবক সানি গুরুংকে দেখতে পেলাম। ইমিগ্রেশন থেকে বেরিয়ে তাকে হাসতে দেখলাম, মনে হলো এবারও আগেরবারের সেই যাত্রাটাই শুরু হতে যাচ্ছে। শুধু আমরাই মাঝখানে কিছুদিনের জন্য হয়তো অন্য কোথাও ছিলাম। অন্য কোথাও বলতে তো সেই ঢাকা। অফিস, রাস্তা, মাসের বাজার, ভাড়া বাসা; যে জীবনে ফিরে গিয়ে ভ্রমণের ছবিগুলো একসময় ফোনের অনেক নিচে নেমে যায়। পরের সফরের আগে সেগুলো আবার খুঁজে বের করতে হয়।
সানির ছবি খুঁজতে হয় না, ও থাকে আমাদের হৃদয়ে। সানি আমাদের বহু বছরের পুরোনো শোফার কাম গাইড। মেঘালয়ে এসে তাকে দেখার মধ্যে বাড়তি একধরনের স্বস্তি আছে। কোথায় যেতে হবে, কোন পথ ভালো, কতক্ষণ লাগবে—কিছু সময়ের জন্য এসব চিন্তা অন্য একজনের ওপরে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেওয়া যায়। ডাউকি বাজারে ব্রেকফাস্ট আর টাকা ভাঙানোর পর শুরু হলো আমাদের শিলং অভিমুখে যাত্রা। এবার দেখার তালিকা ছোট। মাউলিনং, রিওয়াই লিভিং রুট ব্রিজ, স্নোংপেডেং, এলিফ্যান্টস ফলস আগেই দেখা হয়েছে। সেসব বাদ দিতে গিয়ে মনে হলো, একটি জায়গায় ফিরে আসার এটিও সুবিধা—সবকিছু দেখার দায় আর থাকে না। এবড়োখেবড়ো রাস্তা পেরিয়ে সেই সেতুর ওপরে পৌঁছালাম, যাকে ওপারের বাংলাদেশ থেকে দেখে এত দিন শুধু হা-হুতাশই করেছি। উমগটের সাসপেনশন ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে বিষাদ আর ভালো লাগার এক মিশ্র অনুভূতিতে মন ভরে গেল। এতটুকুই তো দূরত্ব! অথচ কী বিশাল বৈপরীত্য আমাদের মধ্যে।


ওখানে বুকভরে নিশ্বাস নেওয়ার পর আবারও চলতে শুরু করল আমাদের গাড়ি। সানি গুরুং গাড়ি তুলছে পাহাড়ের দিকে। নিচের বাজার, মানুষের চলাচল, সীমান্ত পার হওয়ার এতক্ষণের ব্যস্ততা রয়ে গেল পেছনে। রাস্তা বাঁক নিচ্ছে। মাঝেমধ্যে দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে, তারপর কাছের গাছপালা এসে ঢেকে দিচ্ছে। আমরা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি। এখনই কোথাও নামতে হবে না। ঢাকায় গাড়ির জানালা দিয়ে তাকানোরও একটা উদ্দেশ্য থাকে। সামনে জট কতখানি, পাশের লেন এগোচ্ছে কি না, পরিচিত মোড়টি আর কত দূর। সেই অভ্যস্ততায় এখানেও বাইরে দেখতে দেখতে কয়েকবার মনে হলো, আমাদের কিছু একটা হিসাব করার কথা ছিল। কী হিসাব করার কথা ছিল, কিছুক্ষণ পরে তা আর মনে পড়ল না।
পাহাড়ি রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আকাশপানে। মনে প্রতীক্ষা, কখন ছোঁব আরাধ্য মেঘকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা আবিষ্কার করলাম অলৌকিক কোনো এক পুষ্পক রথের মতো আমাদের গাড়ি চলছে মেঘের মধ্যে। পাহাড়ের গায়ে জমাট মেঘ, ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তা নামছে রাস্তার কাছে। সামনের গাড়িটি কখনো দেখা যাচ্ছে, কখনো শুধু তার চলে যাওয়ার দিকটি আন্দাজ করা যাচ্ছে। বিপরীত দিক থেকে ট্রাক আসে, সানি জায়গা দেয়, আবার এগোয়। তীক্ষ্ণ বাঁকের পাহাড়ি রাস্তা, সেই আঁকাবাঁকা পথে বিপরীতমুখী গাড়ি আর ট্রাকের বহর, তাই সাদা সাদা মেঘের কারণে দেখাই যাচ্ছে না কোনো কিছু। অথচ পুরো যাত্রাপথে গাড়ির হর্ন শুনতে পেলাম হাতে গোনা কয়েকটা; হর্ন এত কম বাজছে যে ওটা বাজলেই শুধু খেয়াল হচ্ছে। এখানে লেন ক্রসিং বা ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা নেই বলেই হয়তো আমরা হর্নের বিকট আওয়াজের হাত থেকে বেঁচে গেলাম; একই সঙ্গে টেসলা-টাইপের বাহন না থাকায় যানজটের দৌরাত্ম্যও এই পাহাড়ে নিছক কল্পনামাত্র।


পাহাড়ি রাস্তায় দল বেঁধে একক পদক্ষেপে কাজে নেমেছেন স্থানীয় লোকজন। ধীর কিন্তু অর্থবহ তাঁদের কর্মযজ্ঞ। পথে, পাহাড়ে মানুষ কাজ করছেন; পাশে পড়ে আছে পাথর, ভেজা মাটি, রাস্তার ভাঙা অংশ, জুমের ফসল। গাড়ির ভেতর থেকে তাঁদের অল্পক্ষণের জন্য দেখা যায়। আমরা যে আবহাওয়ায় জানালা খুলে হাত বাড়াচ্ছি, সেই আবহাওয়াতেই তাঁদের দিনের কাজ শেষ করতে হবে। গাড়ি বাঁক নিল। তাঁরা আড়ালে চলে গেলেন আর আমাদের সঙ্গে রয়ে গেল মেঘ। পাহাড়ের গিরিখাত বেয়ে বুকে জল বয়ে নিয়ে ধেয়ে আসছে সেই পরবাসী মেঘ। হাত বাড়ালেই কোমল মেঘ যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের তৃষিত হৃদয়। নাম না জানা নানা ফুল আর বনগুল্মের সমারোহে ঘেরা আমাদের যাত্রাপথ যেন স্বর্গীয় সুধায় ভরা। এমন সৌন্দর্যের পাশে এলে মন ভরে ওঠে এক অজানা বিরহে। সে বিরহ বুকের গহিন থেকে জাগিয়ে তোলে নানান পাওয়া-না পাওয়ার স্মৃতি আর বিষণ্নতা।
এই বিষণ্নতা আমাদের মনের দুয়ারে আরও তীব্রভাবে কড়া নেড়েছিল, যেদিন আমরা গিয়েছিলাম চেরাপুঞ্জিতে। সেদিন মেঘের কোলে রোদ হাসেনি। চারদিকে এত কুয়াশা যে একটু দূরের নোহকালিকাই ফলস ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগেই হয়ে গেছে একপশলা বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি পাথুরে মাটির বুক চিরে বের করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি পারফিউমের মতো সোঁদা গন্ধ। বুনো হাওয়ায় ভেসে আসা সে গন্ধ আমাদের যেন মাতাল করে দিল। আমরা সেদিন হাঁটছি কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে চেরাপুঞ্জির পথে, পুরোটা ঘাসবনে নিজেদের ছাড়া আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য সামনে যতটুকু দেখা যায়, পথ নিয়ে তার বেশি ভাবতেও হচ্ছিল না। কিছুটা পথ হাঁটলে আমাদের সামনে উন্মুক্ত হচ্ছিল আরও কিছুটা পথ। ডানে-বাঁয়ে গিরিখাত, একটু অসাবধান হলেই পাহাড়ি ওই গিরিখাতে পড়ে ইতি ঘটবে দুটি ক্ষুদ্র জীবনের। চারপাশে বাতাসের শনশন, গিরিখাতের নিচ থেকে ভেসে আসছে পোকামাকড়ের একটানা কোরাস আর দেখা না গেলেও শুনতে পাচ্ছি দূরে ঝরে পড়া নোহকালিকাইয়ের অমৃতসম জলরাশির শব্দ। সমতল থেকে স্বর্গের কাছাকাছি উচ্চতায়, গিরিখাতের বিপজ্জনক কিনারার এক বিশাল পাথরের বুকে পা ঝুলিয়ে বসে আমার, কিংবা আমাদের মনে হলো—‘যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের—মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা’।


এই দেখা না হওয়ার বেদনায় আমরা কেঁদে বুক ভাসালাম। আমরা কাঁদলাম আমাদের ফেলে আসা ঘরের জন্য—নিজেদের ঘর বানাব বলে পদ্মার ওপারে আমরা যে ঘরকে ফেলে এসেছি। আজও আমাদের নিজস্ব কোনো ঘর নেই, আবার ফেলে আসা ঘরেও আমাদের আর ফেরা হয় না। আমরা কাঁদলাম সেই সব প্রেমের জন্য; যে প্রেম মোমের কোমল আলোর মতো আমাদের জ্বালিয়ে নিজেই নিভে গেছে। আজও আমরা প্রেম খুঁজে বেড়াই ঠিক যেন ‘প্রকৃত জল খুঁজে বেড়াই জলজ বৃক্ষের মতো’। আমরা কাঁদলাম একান্তই নিজেদের জন্য—এত কিছুর পরও আমরা বেঁচেবর্তে আছি, দুচোখ ভরে শুষে নিচ্ছি পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধকে; পরমাত্মার কাছে কৃতজ্ঞতা জানালাম চোখের জলের অর্ঘ্য দিয়ে। ওর চেয়ে পবিত্রতম আর কোনো কিছুই যে আমাদের দেওয়ার নেই!
তবে মেঘালয়ের দেওয়ার মতো আছে অনেক কিছুই। এই যেমন ডন বসকো মিউজিয়াম। উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর প্রতীক এই জাদুঘর শুধু একটি ভবন নয়; বরং আদিবাসী সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। সন্ত জন বসকো, যিনি সুবিধাবঞ্চিত যুবকদের শিক্ষা ও কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে মিউজিয়ামটি গড়ে তোলা হয়। ভেতরে পা রাখতেই যেন এক জাদুকরি দুনিয়ায় প্রবেশ করলাম। এখানে খাসি, গারো, জয়ন্তিয়া, নাগা, মিজো, বোড়োসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব প্রধান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার এক নিখুঁত কোলাজ সাজানো রয়েছে। ১৭টি থিমভিত্তিক গ্যালারিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাদের ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক, প্রাচীন অলংকার, শিকারের ধারালো অস্ত্র, বাঁশ-বেতের কৃষি যন্ত্রপাতি এবং দুর্লভ বাদ্যযন্ত্রের মতো অমূল্য আর্টিফ্যাক্টস। ডন বস্কো জাদুঘরে ঘুরতে ঘুরতে মানুষের পরিচয়ের প্রসঙ্গটি অন্যভাবে ফিরে এল আমাদের মনে। এক গ্যালারি থেকে আরেক গ্যালারিতে আলাদা জনগোষ্ঠীর জীবন। মনে পড়ল, পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আসার সময় বাইরের সবুজকে মনে হয়েছিল একটানা অথচ ওর ভেতরে কত ভাষা, কত রকম ব্যবহার, কত আলাদা ঘর। জাদুঘরে একই ছাদের নিচে এতগুলো বিচিত্র সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং ওই একই ছাদ থেকে পুরো শিলং শহরের চোখজুড়ানো প্যানোরামিক ভিউ দেখে জুড়াল আমাদের যাযাবর আত্মা।


মেঘালয় এবার আমাদের উপহার দিয়েছে উমিয়াম লেকের মন্দ্রসপ্তক ঢেউ। শিলং-গুয়াহাটি হাইওয়ে ধরে আমাদের গাড়ি যখন পাহাড়ি বাঁক পার হচ্ছিল, ঠিক তখনই পাইনবনের ফাঁক গলে চোখের সামনে ধরা দিল এই বিশাল সবজেটে-নীল জলরাশি—উমিয়াম লেক। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ‘বড়াপানি’ নামে পরিচিত এই কৃত্রিম হ্রদটি মেঘালয়ের অন্যতম প্রবেশদ্বার। ষাট দশকের শুরুতে উমিয়াম নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য তৈরি এই হ্রদটি আজ উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম অনন্য প্রাকৃতিক আকর্ষণ। চারপাশে পূর্ব খাসি পাহাড়ের সবুজ বুক আর মাথার ওপর মেঘের আনাগোনা একে স্কটল্যান্ডের সুন্দর হ্রদগুলোর মতোই এক মায়াবী রূপ দিয়েছে। খাসি সম্প্রদায়ের প্রাচীন ইতিহাস ও ত্যাগের গল্প জড়িয়ে থাকা এই উপত্যকার ঠিক পাশেই রয়েছে অধুনা ভাইরাল হওয়া এক গোপন স্বর্গ—‘লুমের পিংগাদ’, যা পর্যটকদের কাছে মেঘালয়ের ‘মিনি পেহেলগাম’ নামে পরিচিত। পাইনবনে ঘেরা চারদিকের বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ভেসে যাওয়া মেঘ আর এখানকার শান্ত পরিবেশ এক নিমেষেই যেন জুড়িয়ে দেয় তৃষিত হৃদয়কে।
হৃদয়ের তৃষ্ণা জুড়াতে কিংবা আমার আমিকে খুঁজতে গিয়েই মেঘালয়ের প্রেমে পড়া আমাদের। আর আমরা হয়তো সেসব জায়গারই প্রেমে পড়ি, যেসব জায়গায় আমার আমিকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষীণতম সম্ভাবনা আছে। নিজেদের খোঁজার সেই নিরন্তর পথপরিক্রমায় কোনো এক সকালে শিলংয়ের এমএল জিরো ফাইভ বা বাইকার্স ক্যাফেতে ঢুকেছি। চেরাপুঞ্জি যাওয়ার আগে ওখানে বসেছি বটে; কিন্তু উঠতে হবে, এমন তাড়া আমাদের নেই। পাইনবনের মাঝে একচিলতে ঢালু রাস্তা, সে রাস্তার কোল ঘেঁষে পাহাড়ের এক ছোট উপত্যকা, উপত্যকায় ফুটে আছে রঙিন পারিজাত—তার মধ্যেই এই একচিলতে বাইকার্স ক্যাফে। সকালের মৃদুমন্দ বাতাস বইছে শীতল আবেশে, হাতে আগুন-গরম অ্যামেরিকানো নিয়ে শুনছি পাইনের বন থেকে ভেসে আসা অজানা শব্দমালা। সফরে এই সকালগুলো কমই পাওয়া যায়; প্রায়ই সকালের নাশতার সঙ্গে পরের গন্তব্যের হিসাবও শেষ করতে হয়। বাইকার্স ক্যাফেতেই পরিচয় তিব্বতি এক তরুণীর সঙ্গে । সে থাকে ধর্মশালায়, নিজ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করে। ভারতবর্ষ ঘুরছে। তিব্বত, ধর্মশালা—এ নাম দুটি জানা। পড়েছি, সংবাদে দেখেছি। কিন্তু ওই সকালে নাম দুটির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো। সে আমাদের মতোই সফরে আছে; তাঁর দৈনন্দিন কাজের মধ্যে আবার নিজের জনগোষ্ঠীর অধিকারও আছে। আলাপের এই অংশটুকু এখনো মনে রয়ে গেছে।


দেশের বাইরে কাউকে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে আমরা সহজেই বলি, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। তারপর শহর, পেশা, যানজট, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভ্রমণবৃত্তান্ত, কোথায়-কত দিনের জন্য আসা—আলাপ এগোয় এভাবে। মেয়েটির পরিচয়ে জন্মভূমির নাম আর বসবাসের জায়গার নাম পাশাপাশি শুনে নিজের উত্তরটির সহজিয়া ভাবটুকু খেয়াল হলো। তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাস জানি না। তবু পরে মনে হয়েছে, আমাদের ‘কোথা থেকে এসেছি’ প্রশ্নটির উত্তর দিতে যতটুকু সময় লাগে, সবার ততটুকুতে হয় না। ক্যাফের সকালটি সে জন্য অবশ্য থেমে থাকেনি। আমাদের সফরও চলেছে। কিন্তু এখন বাইকার্স ক্যাফের কথা ভাবলে পাইনবন আর কফির সঙ্গে ধর্মশালার নামটিও মনে আসে। অবাক করা ব্যাপার হলো, সেই সকালে আমাদের ওই ক্যাফেতে যাওয়ারই কথা ছিল না। এ যেন নিয়তি দেবীর ইশারায় বাইকার্স ক্যাফেতে দেখা হয়ে গেল আরেক যাযাবরের সঙ্গে; সেও যেন নিজেকে খুঁজতে পথে নেমেছে; পথই যেন আমার, তাঁর, আমাদের সবার তীর্থস্থান।
লোয়ার সোহরার এমনই এক তীর্থসম পথে আমরা হেঁটেছি কোনো এক গভীর রাতে। সে রাতে যে জায়গায় হাঁটছি, সেটা একটা গ্রাম। ঘড়ির কাঁটা জানাচ্ছে তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রির কাছাকাছি। রাস্তার ওপাশে পাহাড়, তারপর সমতল ঢালু উপত্যকা। সেই উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আলো-আঁধারির বাঁকে দেখলাম গিরিখাত থেকে উঠে এল মেঘ; ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল আমাদের। আর ঠিক তখনই কাল চলে যাব ভেবে আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল। এই মন খারাপের জন্য ওই মেঘই যেন দায়ী, ওই মেঘ–পিয়নের ব্যাগের ভেতর যেন ছিল মন খারাপের দিস্তা। মন খারাপের দিস্তা বয়ে নিয়ে আমরা ফিরে এলাম সেখানে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের নিরন্তর যাত্রা।


পরদিন সানি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে চলল অন্য একটা পথ ধরে। এই রাস্তায় আগে আসিনি। ফিরতি পথে নতুন রাস্তা পাওয়াটা এক হিসেবে ভালোই। কারণ, তখন জানালার বাইরে তাকানোর নতুন কারণ থাকে। পাহাড়ের বাঁকগুলো চিনতে হয় না, আগেরবার কতক্ষণ লেগেছিল মনে করে সময় মেলাতে হয় না। কোথাও পৌঁছানোর আগে কী দেখা যাবে, জানা থাকে না। তাই হঠাৎ সামনে আসা সেতুটির ব্যাপারেও আমাদের জানা ছিল না। ওটাকে পেয়েই মনে হলো, কোথায় যেন এই সেতুটি দেখেছি।
বিছনাকান্দি থেকে? দশ বছর হবে, হয়তো বারো। বাংলাদেশের দিকে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের মধ্যে এমন একটি সেতু দেখার স্মৃতি আমাদের আছে। দূর থেকে দেখা। তখন তার ওপর দিয়ে কোথাকার মানুষ কোথায় যায়, জানা ছিল না। বাংলাদেশের সমতল থেকে পাহাড়ের দিকে তাকালে সেতুটিও চোখে পড়ত। পরে বিছনাকান্দির কথা মনে হলে জল আর পাথরের সঙ্গে সেতুটিও অস্পষ্টভাবে স্মৃতিতে থেকে গিয়েছিল।
এটিই কি সেই সেতু? এত বছর পর শুধু স্মৃতি দিয়ে গড়ন মেলানো কঠিন। তবু চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। সানি গুরুং বলল, এদিক থেকে নাকি বিছনাকান্দি দেখা যায়। ও বলার সঙ্গে সঙ্গে বহুদিন আগের সফরের কিছু অংশ স্মৃতিতে ফিরে এল। তবে ঠিক সালটি মনে পড়ল না। কোথায় দাঁড়িয়েছিলাম, কোন দিক থেকে ওপরে তাকিয়েছিলাম, সেটিও নিশ্চিত করে বলা গেল না। আমরা গাড়ি থামিয়ে নিচের দৃশ্যের মধ্যে আমাদের পুরোনো অবস্থান খুঁজছিলাম।
জায়গাটি চেনা, দেখার দিকটি সম্পূর্ণ অচেনা।
সেবার আমাদের চোখ ছিল এদিকে। এই পাহাড়ে। হয়তো এই সেতুতেই। এবার আমাদের চোখ রয়েছে ওদিকে। ওই সমতলে। হয়তো ওখান থেকেও অবাক হয়ে কেউ না কেউ দেখছে আমাদের। মাঝখানে কেটে গেছে দশ–বারো বছর। সেসব বছরের অনেক ঘটনাই এই দৃশ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন। পড়াশোনা শেষ হয়েছে, কাজ বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে; বহুদিনের চেনা মানুষের সঙ্গে এখন কদাচিৎ কথা হয়। সেতুটির কথা কোনো বছরেই বিশেষ করে ভাবিনি। অথচ এত দিন পর কাছে এসে মনে হলো, দূর থেকে দেখা সেতুটি যেন আমাদের আসার অপেক্ষা করছিল।

আসলে অপেক্ষা করার কথা কি? এর ওপর দিয়ে নিশ্চয়ই নিয়মিত গাড়ি যায়। সানির কাছে এই পথ অচেনা নয়। শুধু আমাদের স্মৃতিতে সেতুটি এতকাল দূরে ছিল। বিছনাকান্দির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পুরোনো সফরের সেই পুরোনো মানুষগুলোকে দেখতে ইচ্ছা করছিল। আমাদেরই জীবনের স্রোতে মিশে থাকা দশ–বারো বছর আগের মানুষেরা। মনে হচ্ছিল, তারা ওপারে কোথাও জল-পাথরের মধ্যে দাঁড়িয়ে এদিকপানে তাকিয়ে আছে। ওখানে তাঁদের কোনোভাবেই এখন থাকার কথা নয়, তাঁরা নেই-ও বটে; তবু পরিচিত জায়গা কিংবা পরিচিত মানুষের দিকে অনেক দূর থেকে তাকালে এমন একটা বিভ্রম হয়। সে বিভ্রমের রেশ বয়ে নিয়ে আমাদের গাড়ি এগোল। আরও দু–একটা বাঁকের পর দেখা গেল বাংলাদেশকে। দেশে ফেরার জন্য আমাদের তখনো ডাউকি যেতে হবে। যাত্রা শেষ হয়ে আসছে।
যাত্রা শেষে ঢাকায় এসে মনে হলো, আমাদের হৃদয়ের একটা টুকরোকে আমরা রেখে এসেছি মেঘালয়ের কোলে। কোনো এক মকরসংক্রান্তির প্রাক্কালে আমরা পালিয়ে গিয়েছিলাম জনারণ্য ছেড়ে নিজেকে খুঁজতে। নিজেকে খুঁজে পাইনি বটে, তবে নিজের একটা অংশকে ফেলে এসেছি মেঘালয়ে ঘুরে বেড়ানো কোনো এক মেঘের কোলে। তাই এই শহরে এসেও আমাদের তৃষিত চোখ ওই মেঘদূতের জন্য কাঁদে। বহুতল ভবনের ওপরে আমাদের একঘেয়ে অফিসের আয়োজন, সে আয়োজনে বসে যখন জানালায় কোনো এক শহুরে মেঘকে কোথাও যেতে দেখি, মনে হয় ‘তবু শহরবন্দী মেঘমালা জপে, মোদের তৃষিত চোখ; যেখানেই তুই যাস চলে উড়ে, তোর খুব ভালো হোক।’
