জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, গ্রিস, পর্তুগাল, ইতালি, স্পেন ও আলবেনিয়ায় আন্দোলন জোরালো হওয়ার পাশাপাশি জার্মানির একাধিক শহরেও বড় সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন।
গত সপ্তাহের সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় ফরাসি সরকার বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্যারিসের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন, ল্যুভর জাদুঘর ও শঁজেলিজে এলাকার আশপাশে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে পুলিশ। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সকাল থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
প্রাসঙ্গিক সংবাদ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়ানো এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুও রাজনৈতিক দল ও বড় শহরগুলোর মেয়রদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন।
এদিকে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সসহ দেশটির প্রায় ৫০টি শহরে বুধবার হাজার হাজার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ করেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, আবাসন সংকট মোকাবিলা এবং শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে তাঁরা রাজপথে নামেন। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতিও প্রকাশ করেন।
জার্মানিতেও নতুন বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। ‘জেন জি রেজেল্ট’ নামের একটি যুব সংগঠন আগামী ৩১ অক্টোবর বার্লিন, কোলন, হামবুর্গ ও মিউনিখসহ ২১টি শহরে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বাজেট ছাঁটাই, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে তরুণেরা এতে অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংগঠনটি সহিংসতার বিরোধিতা করলেও ইউরোপের অন্যান্য দেশে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতায় জার্মানির পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির ফেডারেল পুলিশের একটি সংগঠনের প্রধান আন্দ্রেয়াস রসকপফ জানিয়েছেন, বিক্ষোভের মধ্যে উগ্রপন্থিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
পর্তুগালের লিসবন ও পোর্তো শহরে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। তাঁবু সরিয়ে দিয়ে পুলিশ ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করলেও বিক্ষোভ থামেনি বলে জানানো হয়েছে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদেও প্রায় চার সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির সরকার আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতালি ও আলবেনিয়াতেও বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভ করছেন মানুষ।
ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য উগ্র-বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করছে সরকার। তবে বিরোধী দল ও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকারের কঠোর দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনার বৈঠক বর্জন করেছেন চরম ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপ। অন্যদিকে বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলাঁশঁর প্রতিনিধিরা সরকারের কাছে জবাবদিহি ও ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছেন।
প্যারিস, লিঁও ও মার্সেইয়ের মেয়ররাও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, সহিংসতার সময় শহরের বিভিন্ন এলাকা পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায়নি। এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠনে জাতীয় সংহতি তহবিল তৈরির দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের কারণ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। তবে ব্যয়বৃদ্ধি, আবাসনের অনিশ্চয়তা, শিক্ষা খাতের সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, তা নির্ভর করবে সরকারের পদক্ষেপ, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
-20261023070658.jpg&w=1440&q=75)