সম্প্রতি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় অনুসন্ধানে নাম উঠে আসা অভিযুক্তদের একজন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক সোহাগ ফকির। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল২৪ এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে নামাজ পড়ার সুযোগ চাইতে দেখা গেছে।
এর আগে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তারের সময় বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলীও নামাজ পড়ার সুযোগ চেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন অনুসন্ধানের প্রতিবেদক তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফেসবুকে এক পোস্টে তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘আবেদ আলীকে যখন ধরেছিলাম, তিনিও ইন্টারভিউয়ের মাঝপথে বলেছিলেন, ‘‘আমাকে নামাজ পড়ার সুযোগ দিন’’।’
পোস্টে তিনি আরও বলেন, ‘আবেদ আলীর বিখ্যাত উক্তি (যা ইনকাম করেছি সব আল্লাহর রাস্তায় খরচ করেছি)। যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক সোহাগ ফকিরও ইন্টারভিউয়ের মাঝপথে নামাজ পড়ার সুযোগ চাইলেন। মানুষ যুগে যুগে ধর্মকে ব্যবহার করে এসেছে।’
উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২ জন নিয়োগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর আগে ভোরেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। সকাল ৯টার পর প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান বিক্ষুব্ধরা।
এরপর প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে অনুসন্ধানে নামে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সংস্থাটির অভিযানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
গ্রেপ্তাররা হলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮) এবং দুই চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)।
সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ছায়াতদন্ত শুরু করে এসআরবি। অনুসন্ধানে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এর ভিত্তিতে বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য উৎস, সরবরাহের ধাপ এবং চক্রের সদস্যদের মধ্যে প্রশ্নপত্র বিতরণের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, গত বুধবার মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের আরও সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। এ ছাড়া এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী আসাদুল ইসলামকে রাজধানীর উত্তরখান ও মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের মূল হোতা হিসেবে কাজ করতেন এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ। বৃহস্পতিবার এসআরবি-৪-এর একটি দল সাভার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার মোহাম্মদপুর থেকে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশ্নপত্র কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, সে বিষয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে প্রশ্নপত্র ও উত্তর চক্রের অন্য সদস্য এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এসআরবির এই কর্মকর্তা আরও জানান, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তবে প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
এদিকে, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আলোচনায় আসা সোহাগ ফকিরকে নিয়ে চ্যানেল২৪ এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রথমে নিজের কার্যালয়ে দেখা করতে রাজি হননি। পরে ফার্মগেটের একটি রেস্তোরাঁয় দেখা করেন। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা কথা হলেও তিনি প্রথমে মুখ খুলতে চাননি। একপর্যায়ে তথ্য-প্রমাণ দেখানোর পর সোহাগ নামাজ পড়তে দাঁড়ান।
পরে সোহাগ ফকির দাবি বলেন, আমার পরিচিতের ৩-৪ জনের পরীক্ষা ছিল। ওদের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ডাটা ইন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম। তখন ওর মাধ্যমে প্রশ্নটা পেয়েছিলাম।
এর আগে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় তার সঙ্গে পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে আবেদ আলীর বিরুদ্ধে।
