আমাদের পরিবারে বা আশপাশে যে প্রবীণ নারীটি বার্ধক্যের যন্ত্রণায় একলা বসে থাকেন, তার দিকে কি আমরা কখনও সত্যিই গভীরভাবে তাকাই? যে হাতের স্পর্শে একদিন আমাদের পুরো সংসার গোছানো থাকত, বয়সের ভারে আজ তিনি বড় একা, বড় উপেক্ষিত। শৈশবে যিনি আমাদের প্রতিটি পদে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার ছোট ছোট ইচ্ছা আমাদের সংসারের ব্যস্ততায় হারিয়ে যায়। বয়সের কারণে শরীর ভাঙবে, ব্যথায় কাবু হবেন- এই সত্যিটাকে মেনে নিতে নিতে আমরা এতটাই উদাসীন হয়ে পড়ি যে, তার মনের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসগুলো আমাদের চোখে আর পড়ে না।
চল্লিশ-পঞ্চাশের কোঠায় পা রাখতেই নারীর শরীরে হরমোনজনিত বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। মেনোপজের পরের অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা হৃদরোগ যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামীণ নারীরা তো সারাজীবন রোদে পুড়ে, চুলার ধোঁয়ায় নিজেকে নিংড়ে দিয়ে সংসারের ঘানি টানেন। কিন্তু তাদের এই হাড়ের ব্যথা, মাথা ঘোরা বা দীর্ঘস্থায়ী কষ্টগুলোকে পরিবার সহজে গুরুত্ব দিতে চায় না; ভালো একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ চেকআপ করানোর কথা কেউ ভাবতেও চায় না। ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে তারা দিন কাটান, আর ভেতর ভেতর কুরে কুরে খায় অজস্র অপ্রকাশিত কষ্ট।
শারীরিক এই যন্ত্রণার চেয়েও আরও গভীর ও অদৃশ্য এক সংকট হলো মানসিক একাকিত্ব। সঙ্গী হারানোর শোক, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে ওঠার রূঢ় বাস্তবতায় প্রবীণ নারীরা চরম মানসিক শূন্যতায় ভোগেন। সন্তানরা নিজেদের চাকরি ও সংসার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে মায়ের সঙ্গে মন খুলে দুটো কথা বলার ফুরসতটুকুও তাদের থাকে না। একই ছাদের নিচে থেকেও যেন তারা এক অচেনা দ্বীপে বাস করেন। কত প্রবীণ নারী যে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না, বুকের মধ্যে জমাট বাঁধা কষ্টগুলো কাউকে বলতে না পেরে চোখের জলে বালিশ ভেজান- তার খবর আর কজন রাখি? এক কাপ চা খাওয়ার, একটু নিবিড় গল্প করার মানুষ না থাকাটাই অনেক প্রবীণ নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় হাহাকার।
এরই পাশাপাশি আইনি ও সামাজিক অধিকারের প্রশ্নেও তাদের বঞ্চিত করার প্রবণতা কম নয়। স্বামী বা বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তির সঠিক অংশ থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রাখার ঘটনা আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। আইনি জটিলতা, অজ্ঞতা আর সামাজিক লজ্জার ভয়ে তারা নিজের অধিকারের দাবিটুকুও মুখে তুলতে পারেন না। একক পরিবারের রূঢ় বাস্তবতায় অনেক মায়ের শেষ ঠিকানা হয় অবহেলিত কোনো ছোট ঘর কিংবা বৃদ্ধাশ্রম। অথচ জীবনের এই সায়াহ্নে একটু সম্মান, একটু নিরাপত্তা এবং নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার তো তাদের মৌলিক প্রাপ্য। প্রবীণ হিতৈষী আইনের কথা কাগজে-কলমে থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এই অচলায়তন ভাঙতে হলে সবার আগে দরকার আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল বদল। প্রবীণ নারীদের ‘অতিরিক্ত বোঝা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে তাদের পরিবারের মূলস্তম্ভ হিসেবে সম্মান দিতে হবে। মাসে অন্তত একবার রক্তচাপ, শর্করা, হাড়ের ঘনত্ব এবং দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের খাবারের পাতে পুষ্টিকর ও ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার তুলে দিতে হবে। প্রতিদিন কাজের ফাঁকে কিছু সময় তাদের পাশে বসে পুরনো দিনের গল্প শোনা, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পছন্দের কোনো জায়গায় একটু ঘুরিয়ে আনা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে জাদুর মতো কাজ করে। এ ছাড়া তাদের প্রাপ্য সম্পত্তি, খোরপোষ ও সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা পাওয়ার বিষয়ে পরিবার ও সমাজকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক কেন্দ্র বা ক্লাবে তাদের সমবয়সী মানুষের সঙ্গে ভাববিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া উচিত, পরিবারের শিশু ও তরুণ সদস্যদেরও শেখাতে হবে কীভাবে প্রবীণদের সম্মান ও সঙ্গ দিতে হয়। তাদের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও আশীর্বাদই আমাদের আগামী দিনের পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
যিনি একসময় নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে আমাদের তিল তিল করে বড় করেছেন, বার্ধক্যের এই পড়ন্ত বেলায় তার মুখে একটু হাসি ফোটানো আমাদের পরম নৈতিক দায়িত্ব। অবহেলার বদলে সম্মান, একাকিত্বের বদলে সঙ্গ আর অসহায়ত্বের বদলে নিরাপত্তা- এর বাইরে তাদের বিশেষ কিছু চাওয়ার থাকে না। প্রবীণ নারীর যত্ন কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি তাদের জন্মগত অধিকার। বার্ধক্যের এই অন্তিম বেলায় প্রবীণ নারীদের প্রতি আমাদের ছোট্ট একটু মনোযোগ তাদের জীবনকে করে তুলবে অর্থপূর্ণ ও নিরাপদ।
