মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনায় সমালোচনার মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তিনি বলেছেন, তাঁর কারণে বিএনপি ও সরকার যেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না পড়ে, সে জন্যই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লেও মাদক নির্মূলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। তাঁর সঙ্গে কয়েক শ নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বেচ্ছায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মতি দিয়েছেন।
ইশরাক বলেন, তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য। গত ১২ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। সেই অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে গত দুই দিন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন।
‘গণমাধ্যমের ভূমিকায় হতাশ হয়েছি’
মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে থাকার বিষয়ে ইশরাক বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি মাদকবিরোধী অভিযান সমন্বয় করতে গিয়েছিলেন। নিজের নিরাপত্তার জন্য তাঁর হাতে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তবে ওই ঘটনার ছবি প্রকাশের পর মূলধারার গণমাধ্যম বিভিন্ন ধরনের বয়ান তৈরি করে সংবাদ প্রকাশ করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইশরাক বলেন, ‘গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হলো।’
অভিযানে কারও ক্ষতি হয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখপ্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি। আমি কেবল আমার নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্রটুকু যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম, পরবর্তীকালে সেটি আর আমার দৃশ্যমান হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের দিন হতে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, এবং আমি উনাকে বলেছি পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরবর্তীতে আরও যদি এলাকা থাকে সেখানকার মাদক নির্মূল এবং আমাদের জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সম্মত হয়েছেন। সদয় সম্মত হয়েছেন। এবং আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন, ঠিক আছে যাও এলাকা ঠিক করে এলাকায় কাজ কর।’
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে তৈরি পরিস্থিতিতে তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে পদত্যাগের ইচ্ছা জানান, যাতে দল বিব্রত না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজে বাধা সৃষ্টি না হয়। সরকারের দায়িত্ব ছাড়লেও মাদক নির্মূলে কাজ করার অনুমতি চেয়েছেন বলে জানান তিনি।
অস্ত্র হাতে অভিযানের পর সমালোচনা
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়।
এরপর রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে আগের রাতে পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রতিমন্ত্রীর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সেটিকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছিলেন।
সোমবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টেও ইশরাক জানান, বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। পোস্টে তিনি বলেন, সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে আরও বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবেন। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি জোরদার করা এবং প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে বিভিন্ন জেলা সফরের কথাও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধা ঘণ্টা আগে প্রেসক্লাবে পৌঁছান ইশরাক। এ সময় তাঁর সঙ্গে শত শত নেতা-কর্মী ছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। পরে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রেসক্লাবের তৃতীয় তলার আবদুস সালাম হলে যান তিনি। প্রায় আধা ঘণ্টার সংবাদ সম্মেলনে নিজের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ও মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন ইশরাক।
সানা/আপ্র/১৯/১০/২০২৬
