শিক্ষার আলোয় বৈষম্যের অন্ধকার দূর করা, বাল্যবিবাহের শৃঙ্খল ভাঙা আর নেতৃত্বের আসনে মেয়েদের এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এক দিনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের প্রতীকী দায়িত্ব পালন করেছে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শীতল। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে তার এই ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা যেন মনে করিয়ে দিল- সুযোগ পেলে কন্যারাও পারে নেতৃত্ব দিতে, বদলে দিতে পারে সমাজের প্রচলিত ধারণা।
স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের পথ সব মেয়ের জন্য সমান মসৃণ নয়। কারও সামনে আর্থিক সংকট, কারও সামনে সামাজিক বাধা, আবার কারও জীবনে অকালেই নেমে আসে বাল্যবিবাহের চাপ। এমন বাস্তবতায় শীতলের এক দিনের প্রতীকী উপাচার্য হয়ে ওঠা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের ঘটনা নয়; বরং এটি মেয়েদের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।
গতকাল ছিল আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এ উপলক্ষে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘গার্লস টেকওভার’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের প্রতীকী দায়িত্ব পালনের সুযোগ পায় ঢাকার এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শীতল। এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কন্যাশিশুর শিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সিদ্ধান্ত
গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মেয়েদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের বৈশ্বিক এ কর্মসূচির লক্ষ্য- মেয়েদের নেতৃত্বের সক্ষমতা দৃশ্যমান করা, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। এ কর্মসূচির আওতায় কিশোরীরা প্রতীকীভাবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দূতাবাস ও উন্নয়ন সংস্থার নেতৃত্বের আসনে বসার সুযোগ পাচ্ছে।
শীতলের কাছে এই অভিজ্ঞতা কেবল এক দিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার স্মৃতি নয়, বরং নিজের স্বপ্নকে নতুন করে উপলব্ধি করার উপলক্ষ। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন যুব ও কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকে সে কাজ করেছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা এবং নারী ও মেয়েদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে। আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ ও জলবায়ুজনিত সমস্যা কীভাবে মেয়েদের সম্ভাবনাকে সীমিত করে, সেই বাস্তবতাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছে সে।
নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির কথা জানাতে গিয়ে শীতল বলে, শিক্ষার সত্যি কোনো বিকল্প নেই, আর এই মুহূর্তে আমাদের হাতে যে সময়টুকু আছে, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। স্যারের দেওয়া উপদেশ ও শিক্ষাগুলো আমি আজীবন মনে রাখব। নিজের পড়াশোনা শেষ করে স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছানোর জন্য আজ নিজেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংকল্পবদ্ধ মনে হচ্ছে।
শীতলের এই উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলামের বার্তা। তিনি বলেন, শীতলের মতো প্রত্যেক কন্যার স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার দরজা খোলা রাখতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ দিতে হবে। কন্যাশিশুর শিক্ষা ও অধিকারে বিনিয়োগ একটি সমতাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ার ভিত্তি। ‘গার্লস টেকওভার’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়ে শীতল বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব এবং শিশু অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো তুলে ধরে। পাশাপাশি তরুণীদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে স্বাধীন, নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।
বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বাল্যবিবাহ এখনও বড় বাধা। অল্প বয়সে বিয়ে শুধু একটি মেয়ের শৈশব কেড়ে নেয় না; ব্যাহত করে তার শিক্ষা, সীমিত করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত করে। এ বাস্তবতায় মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি করা টেকসই ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।
এ বছরের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য- বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে এবং কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বছরের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- ‘শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’। প্রতিপাদ্যের এই আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দিতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এ বছর জাতীয় পর্যায়ে আরও কয়েকটি ‘গার্লস টেকওভার’ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এসব উদ্যোগে কিশোরীরা প্রতীকীভাবে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, কূটনৈতিক মিশন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের আসনে বসবে। এর মধ্য দিয়ে মেয়েদের মতামত প্রকাশ, আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা বিকাশের বিষয়গুলো সামনে আসবে।
শীতলের এক দিনের এই দায়িত্ব পালন তাই নিছক প্রতীকী আয়োজনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য— মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সুযোগ, সহায়ক পরিবেশ এবং তাদের সক্ষমতার প্রতি আস্থা। তাদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া, মতামতকে মূল্যায়ন করা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে বৈষম্য ও বাল্যবিবাহের বাধা পেরিয়ে তারা নিজেরাই গড়ে তুলতে পারবে নিজেদের ভবিষ্যৎ।
এক দিনের জন্য উপাচার্যের দায়িত্ব পালন শেষ হলেও শীতলের সামনে স্বপ্নের পথ দীর্ঘ। সেই পথে তার ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে অসংখ্য কন্যাশিশুর এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা। যে সমাজে মেয়েরা শুধু স্বপ্ন দেখবে না, বরং নিজেদের যোগ্যতায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগও পাবে- আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে শীতলের অভিজ্ঞতা সেই সমাজ গড়ারই আহ্বান জানায়।
