যে বয়সে বাবার হাত ধরে পূজামণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সে বয়সে যুথি মনি পালের দিন কাটছে অন্য এক ব্যস্ততায়। পূজার আনন্দ উপভোগ করার বদলে তাকে ছুটতে হচ্ছে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে। উদ্দেশ্য, নিজের হাতে গড়া দুর্গাপ্রতিমা বিক্রির বকেয়া টাকা সংগ্রহ করা। তিন মাস ধরে দিন-রাত এক করে প্রতিমা তৈরি করেছেন তিনি। এখন সেই পরিশ্রমের পাওনা বুঝে নিতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরছেন।
শেরপুর সদর উপজেলার ভাতশালা ইউনিয়নের বয়রা পরানপুর পালপাড়া গ্রামের এই তরুণীর কাঁধে এখন পরিবারের দায়িত্ব। সদ্য এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যুথি নিজের হাতে ১৮টি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে এ বছর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সরবরাহ করেছেন। তার উপার্জনেই চলছে মা ও ছোট বোনের সংসার, মেটাতে হচ্ছে তাদের পড়াশোনার খরচও।
অথচ যুথির স্বপ্নটা ছিল অন্য রকম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়বেন, একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেন ভাস্কর্যশিল্পী হিসেবে। বাবার চেয়েও বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালে বাবার মৃত্যুতে সেই স্বপ্নের পথে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। তবু থেমে যাননি যুথি। বাবার কাছ থেকে শেখা সামান্য অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে সংসারের হাল ধরেছেন, বুকের ভেতর আগলে রেখেছেন নিজের স্বপ্নও।
যুথি মনি পাল বয়রা পরানপুর পালপাড়া গ্রামের দীপক কুমার পালের দ্বিতীয় মেয়ে। বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরি ও মাটির নানা ধরনের সামগ্রী তৈরির কাজ করতেন তার বাবা। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখেছেন যুথি। ধীরে ধীরে শিখেছেন খড় ও মাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি, রং করা এবং প্রতিমায় পোশাক পরানোর কাজ।
তখন হয়তো বুঝতে পারেননি, বাবার কাছ থেকে শেখা এই কাজই একদিন পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে উঠবে।
তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে। মেজ মেয়ে যুথি এবার শহরের মডেল গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ছোট মেয়ে প্রিয়াঙ্কা রানী পাল স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।
২০২৪ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা যান দীপক কুমার পাল। স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী রেখা রানী পাল দুই মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ে তার।
সেই কঠিন সময়ে বাবার কাজের হাল ধরেন যুথি। কোমল হাতে তুলে নেন খড় আর কাদামাটি। বাবার কাছ থেকে শেখা কাজ দিয়েই শুরু করেন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা।
বাবার মৃত্যুর পর গত দুই বছরে প্রতিমা তৈরির কাজ করে মোটামুটি ভালোই সাড়া পেয়েছেন বলে জানান যুথি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ বছর দুর্গাপূজার জন্য ১৮টি প্রতিমা তৈরি করেন তিনি। কাজের চাপ সামলাতে বাবার মতোই তিনজন কারিগর নিয়োগ দেন। তাদের প্রত্যেককে মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়।
পূজার আগেই মণ্ডপের লোকজন এসে প্রতিমাগুলো নিয়ে গেছেন। তবে কিছু টাকা বকেয়া রয়েছে। সেই টাকা আদায়ের জন্য এখন প্রতিদিন একবেলা করে বিভিন্ন মণ্ডপে ছুটছেন যুথি। আশা করছেন, পূজা শেষ হওয়ার আগেই পাওনা টাকা বুঝে পাবেন।
এই উপার্জন শুধু তার নিজের নয়, পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। সংসারের খরচের পাশাপাশি মা ও ছোট বোনের পড়াশোনার ব্যয়ও তাকেই বহন করতে হচ্ছে।
যুথি মনি পাল বলেন, ‘আমার খুব স্বপ্ন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়ব এবং একজন ভাস্কর্যশিল্পী হব। কিন্তু হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা অথৈ জলে পড়ে যাই। নিজের সেই স্বপ্নকে বুকে চেপে বাবার কাজের হাল ধরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই বছরে মোটামুটি বেশ ভালো প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছি। তা দিয়েই সংসার টিকিয়ে রেখেছি। সংসার চালানোর পাশাপাশি আমার, মা ও ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও এখান থেকে চালাতে হচ্ছে।’
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অন্য শিক্ষার্থীদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল যুথির। কিন্তু প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। প্রায় তিন মাস ধরে পূজার প্রতিমা তৈরির কাজে সময় দিতে হয়েছে তাকে।
তবু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আশা ছেড়ে দেননি। এখন ভর্তি গাইড বই পড়ে নিজেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ভাবছেন। হাতে যতটুকু সময় আছে, সেটুকু কাজে লাগিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে চান তিনি।
যুথি বলেন, ‘ভাবছি, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি গাইড পড়ে এভাবেই পরীক্ষা দেব। যেটুকু সময় আছে, এর মধ্যেই চেষ্টা চালিয়ে যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য। বাকিটা ভগবানের ইচ্ছা।’
নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি বাবার রেখে যাওয়া প্রতিমা তৈরির কাজও চালিয়ে যেতে চান যুথি। সংসারের দায়িত্ব পালন করে একদিন শিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার প্রত্যাশা তার।
মেয়ে যখন খড়-মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করেন, তখন মায়ের মনে পড়ে যায় পুরোনো দিনের কথা। পূজার সময় তিন মেয়েকে হাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরিয়ে প্রতিমা দেখাতেন তাদের বাবা। সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।
রেখা রানী পাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই পূজার সময় আমার তিন মেয়েকে হাতে ধরে তাদের বাবা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে পূজা দেখাতেন। কিন্তু তাদের বাবা মারা যাওয়ার পর সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।’
মেয়ের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এইটুকু কচি বাচ্চার হাতে খড়-মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করতে দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। তারপরও করার কিছু নেই। ভগবানই দেখবেন— এই আশা নিয়েই বেঁচে আছি।’