দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ আদায়ে দুর্বলতা ও আস্থার সংকটে ভালো নেই দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাত। একদিকে কমেছে মোট ঋণের স্থিতি, অন্যদিকে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। একই সময়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান- উভয় পর্যায়ে ঋণ হিসাবের সংখ্যাও কমেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে এ খাতে মোট ঋণের স্থিতি কমেছে প্রায় ৩১০ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬২ কোটি টাকা। আর ঋণ হিসাব কমেছে ৪ হাজারেরও অধিক। তবে এই তিন মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, নানা অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণে দেশের বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। এসব সমস্যার প্রভাব পুরো খাতের ওপর পড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ, ঋণ বিতরণে যথাযথ যাচাই, শক্তিশালী তদারকি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আমানতকারীদের
স্বার্থ সুরক্ষায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রমে গতি ফেরানো কঠিন হবে।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের (পিটিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির চারটি প্রধান ভিত্তি হলো ব্যাংকিং খাত, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা খাত ও পুঁজিবাজার। বর্তমানে এই চারটি খাতই নানা সমস্যায় রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে হলে এই চারটি খাতকেই শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য সব খাতেই সুশাসন, কার্যকর নীতি ও মানুষের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে এসব খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। আর আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে সামগ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের স্থিতি ছিল ৭৮ হাজার ৪২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ১১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ঋণের স্থিতি কমেছে ৩১০ কোটি ২১ লাখ টাকা বা প্রায় শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬২ কোটি ৯ লাখ টাকা। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ২৫৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে মোট ঋণের স্থিতি কমলেও খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে। ঋণ আদায়ে দুর্বলতা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কায়সার হামিদ আমাদের সময়কে বলেন, ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঘটেনি; দেশের ব্যাংকিং খাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমানে বিভিন্ন সমস্যার কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে না। ফলে নতুন ঋণের চাহিদাও কম। তিনি আরও বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমে আসা এবং সরকারের নীতিসুদ হ্রাসেরও প্রভাব রয়েছে। আমানত বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের সাত থেকে আটটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাতেই পুরো খাতের মোট আমানতের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণই মূলত খাতের মোট আমানতের বড় অংশ।
পুরুষ ও নারী উভয় গ্রাহকের ঋণই কমেছে : প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুনে পুরুষদের ঋণ কমেছে ১৯০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বা ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। জুন শেষে এ খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পুরুষ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ কমেছে ১৭৪ কোটি ২ লাখ টাকা বা শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ। জুন শেষে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০ হাজার ৬২৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। নারীদের ঋণও কমেছে ৩৫ কোটি ৭ লাখ টাকা বা ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। জুন শেষে এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। তবে নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ বেড়েছে ৮৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। জুন শেষে এ খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। মোট ঋণের বড় অংশই রয়েছে পুরুষ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে। জুন শেষে মোট ঋণের ৭৭ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের। একক পুরুষদের অংশ ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে, একক নারীদের অংশ ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অংশ ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
আমানত বাড়ছে : গত জুন শেষে এনবিএফআই খাতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। এর আগে গত মার্চ শেষে আমানত ছিল ৫১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় ৭৯৮ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ সময়ে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় ধরনের আমানতের পরিমাণও বেড়েছে। গত জুন শেষে ব্যক্তিপর্যায়ে পুরুষদের আমানত দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। তিন মাসে পুরুষদের আমানত বেড়েছে ২৩৬ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ সময় পুরুষ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আমানত দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে ৩০৭ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে জুন শেষে ব্যক্তিপর্যায়ে নারীদের আমানত দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। তিন মাসে এ আমানত বেড়েছে ২২০ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আমানতও বেড়েছে ৩৫ কোটি টাকা ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। মার্চে ৭০৯ কোটি টাকার কাছাকাছি থাকা এ আমানত জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৭৪৩ কোটি টাকায়।
সংকট উত্তরণে কঠোর পদক্ষেপ : নানা অনিয়মের কারণে সংকটে থাকা পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই অবসায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। অবসায়ন হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স কোম্পানি, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম, যিনি এস আলম নামে পরিচিত। অন্য চারটির নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেলেঙ্কারির দায়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদার বা পিকে হালদারের হাতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ তহবিল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
