নেত্রকোনার দুর্গাপুরে মাদকের চালান দেখে ফেলা ও তাতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক যুবদল নেতার পরিবারের সদস্যদেরকে নির্যাতন ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে মো. জাহাঙ্গীর (৫০) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম দুর্গাপুর উপজেলার শিমুলতলী গ্রামের বাসিন্দা এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুর্গাপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন ইমান আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা।
জানা গেছে, তিনি দুর্গাপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও মিনকিফান্দা গ্রামের বাসিন্দা। জাহাঙ্গীরের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা।
লিখিত বক্তব্যে ইমান আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জাহাঙ্গীর আলম এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, সীমান্তে মাদক পাচার, জমি দখল ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন।
ইমান আলীর অভিযোগ, গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে তার ছোট ছেলে মো. রায়হানকে (২৩) মোবাইলে ময়মনসিংহের চরপাড়া এলাকায় ডেকে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাকে অপহরণ করে সাড়ে তিন কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে এ ঘটনায় ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
তার দাবি, মুক্তিপণ দাবিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে পুলিশি পদক্ষেপ শুরু হলে অপহরণকারীরা বিষয়টি জানতে পারে। এরপর রায়হানকে চোখ ও হাত-পা বেঁধে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়।
উদ্ধার করার পর ছেলেকে মারধরের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বর্তমানে সে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে এবং চিকিৎসা চলছে। তার দুই ছেলে জুয়েল ও রায়হানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ইমান আলী বলেন, ভারত থেকে আনা একটি বস্তুকে প্রসাধনী পণ্য বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা বস্তাটি খুলে ফেনসিডিল দেখতে পান বলে দাবি করেন। এ ঘটনায় তারা প্রতিবাদ করায় জাহাঙ্গীর আলম ক্ষুব্ধ হন এবং এরপর থেকে তাদের ওপর চাপ ও হুমকি বাড়তে থাকে। রাতে লোকজন নিয়ে তার বাড়িতে গিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখানো ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি পুলিশ ও সাংবাদিকদের কাছে এসব বিষয়ে অভিযোগ না করেন।
জাহাঙ্গীর আলম এলাকায় নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার বিরুদ্ধে কথা বললে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে তাকে নিজ বাড়ি ছেড়ে নেত্রকোনার বাইরে থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া নিরীহ মানুষের বাড়িতে গোপনে মাদক রেখে পুলিশে খবর দিয়ে তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে এলাকার কয়েকটি পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
ইমান আলী আরও বলেন, নিজের রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তিনি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নিজ বাড়িতে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তিনটি দাবি জানান। জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, তার ছেলেকে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং তাকে ও তার পরিবারকে নিজ বাড়িতে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
ইমান আলীর পুত্রবধূ আফরোজা সুলতানা অভিযোগ করেন, তার স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে থাকতে না পারায় তাদের নারীদেরও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
তার স্বামীকে অপহরণ করে সাড়ে তিন কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে তারা অভিযোগ করছেন। পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে যাওয়ার পর তার স্বামীকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়।
তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা সব সময় আতঙ্কে রয়েছেন। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিচার এবং আইনগতভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, আমি কোনো ধরনের চোরাচালান, মাদক কারবার কিংবা অন্যের জমি দখল করিনি। এসব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ। ইমান আলী ও তার পরিবারের সঙ্গে একসময় আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তাদের কাছে আমি বেশ কয়েক লাখ টাকা পাই। পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমদ খান বলেন, অপহরণের বিষয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে শুনেছি। দুর্গাপুর থানায় এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
