অভীক বলেছিল, ‘কাজের খুব চাপ ছিল, কাজের কথা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারতাম না, কী ভাবে আরও উন্নতি হবে, টপ বস হব, সকলের মাথায় থাকব, সেই চিন্তায় দিন যেত, আমার স্ত্রীও তা-ই চাইত, তার বাবা ছিলেন উচ্চ পদে, বাবাই বলত মেয়েকে, অ্যাম্বিশন না থাকলে হবে না, লেখার উপায় ছিল না।’
অচিন্ত্য বলল, ‘তুমি লেখোনি, এর জন্য স্ত্রীকে দোষ দিলে হবে?’
অভীক বলেছিল, ‘দোষ দিচ্ছি না, ও অমন চাইত, এখনও তা-ই চায়।’
— তুমি যদি অন্য রকম চাও, তা বলোনি কেন তোমার ওয়াইফকে?
অভীক চুপ করে ছিল। অভীকের কি মনে হয়েছিল, সামান্য স্কুল মাস্টারের চাকরি ছেড়ে অনেক উঁচুতে উঠতে চেয়েছিল সে? কেরিয়ার গড়বে। এবং এ সব সে করেছে গোপনে। যখন সে একটি স্বাভাবিক মৃত্যু লিখছে, তখনই সে চেষ্টা করছিল মাস্টারির চাকরি ত্যাগ করতে। অল্প বয়সে গ্রামে গিয়েছিল মানুষকে সংগঠিত করতে। সংগঠিত মানুষ বিপ্লব করবে। সেই স্বপ্ন পূরণ না হলে ফিরে এসে লিখতে শুরু করে। আরম্ভেই সাড়া জাগিয়েছিল। তখন প্রাক্তন বিপ্লবীদের কেউ কেউ বলত, অমলেশ রায় সংগঠনের অনেক কথাই পুলিশকে জানিয়ে দেওয়ায়, না মরে বহাল তবিয়তে গল্প লিখছে, সাহিত্য করছে। এ সব কথা অচিন্ত্যর কানে আসত। মিলিয়েও যেত। অমলেশ রায়, মানে অভীক দাস চমৎকার লেখে। কে যেন বলল, অভীক যখন ভুতনির চরে আত্মগোপন করেছিল, ওর নাম ছিল অভীক দাস। ওই নামেই সে লুকিয়েছিল। সেই নামকে ব্যবহার করছে, এইটা অন্যায় না?
অচিন্ত্য বলেছিল, ‘কী অন্যায়?’
— ভুতনির কর্মীরা জানত ও অভীক দাস, অমলেশ রায় নয়, সেই নাম ত্যাগ করে বিপ্লবের বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত ছিল।
— বিপ্লব তো হয়নি, বিরুদ্ধে গেল কী করে?
সেই প্রাক্তন বিপ্লবী বলেছিল, ভূতনির চরের মানুষের দুর্দশা মোচন করতে গিয়ে সে নিয়ে এল কল্পিত গল্প, এইটা প্রতিবিপ্লবী কাজ।
অচিন্ত্য বুঝেছিল তার পার্টির লোকজন অমলেশের উপর ক্ষুব্ধ। বিপ্লব হয়নি বলে কি হবে না কখনও? হবে। সময়েই হবে। ভুতনির চর গঙ্গার একটি দ্বীপের মতো। বন্যায় ভাসে প্রতি বছর। রিং বাঁধ নিয়ে বন্যা ঠেকানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু কিছুই হয় না। বাঁধ ভেঙে বন্যার জল ঢোকে ভিতরে। ঠিকেদার, সরকারি ইঞ্জিনিয়ার, কর্মচারী বাঁধের টাকা ভাগাভাগি করে নেয়। এইটা গল্পে না লিখে সংগঠিত প্রতিবাদ করতে পারত অভীক দাস। পালিয়ে আসে। পুলিশের কাছে সারেন্ডার করে সব বলে দেয় (শেষ কথাটি মিথ্যে মনে হয়েছিল অচিন্ত্যর)।
সব মনে পড়ছিল। তখন অভীক বলল, ‘আমার বিরুদ্ধে যা যা রটেছিল, সব মিথ্যে তা জানো?’
— কী রটেছিল?’
— আমি সারেন্ডার করিনি, জেল খেটেছিলাম, সকলে যে সময়ে মুক্তি পায়, জরুরি অবস্থা উঠে গেলে, তখন রিলিজ় হই, জেলখানায় আমার পরিবর্তন হয়, লিখব ভাবি।
— জেল খাটার কথা কি তোমার কমরেডরা জানত না?
— না, জানার কথা নয়, কিন্তু আমি সরে আসছি তখন, বাড়ির লোক ব্যতীত আর কারও সঙ্গে দেখা করতাম না, পার্টির লোক আসত দেখা করতে, তারা কয়েদিদের ভিতর যোগাযোগের ব্যবস্থা করত।
অচিন্ত্য এ সব নতুন কথা শোনে। অমলেশের জেলযাত্রার কথা সে আগে শোনেনি। তবে ওর গল্পে কারাবাসের এক বিবরণ ছিল। তাতে মনে হয়নি জেল না খেটে লেখা। এখন তাকে ভুলে গেছে সকলে। কমরেডরা বসে গেছে। সংসারী হয়েছে। বাম শাসনে নিজেদের ব্যবস্থা করে নিয়েঋছে। অভীক, মানে অমলেশ অবশ্য নিজেই নিজেকে দাঁড় করিয়েছিল। স্কুল মাস্টার থেকে টপ বস। অভীক বলল, ‘আমার লেখালিখি সহ্য করতে পারেনি কেউ কেউ, বিপ্লব না করে ফেরা কমরেডরা, আমি অভিজ্ঞতাকে এ ভাবে কাজে লাগাব, এইটিই ছিল অসহ্য। আমিও আরও শোধ নিতে হয়ে গেলাম বহুজাতিক কোম্পানির অংশ।’
— ভুল করেছিলে, তাতে আরও নিন্দিত হয়েছিলে।
— আমি তো নিন্দাই চাইছিলাম। অভীক হাসল, ‘ক্রোধে নিন্দা করে লোকে, তুমি যদি নিন্দিত না হও, তুমি তা হলে সমাজে কোনও ছাপ ফেলতে পারোনি বলা যায়, তুমি অচিন্ত্য পাল, আমার কাছে সম্মাননীয় ঔপন্যাসিক, কিন্তু কতজন তোমার নিন্দা করে আড়ালে, তা তুমি জানো?’
অচিন্ত্য বলেছিল, ‘আড়ালে কেন, সামনে, সাহিত্যসভায় ডেকে নিয়ে গিয়ে মঞ্চে বসিয়ে নিন্দা করেছে।’ বলে হেসেছিল অচিন্ত্য।
— তখন তুমি কী করেছিলে?
অচিন্ত্য বলেছিল, ‘আরও একটা ভালো গল্প লিখতে চেয়েছিলাম, লিখেওছিলাম একটি ভালো উপন্যাস, পুনরুজ্জীবন।’
— আমিও যখন শুনতে পাচ্ছিলাম নিন্দা, আর প্রতিষ্ঠানের দালাল, বিশ্বাসঘাতক তকমা, তখন মনে মনে ঠিক করলাম, প্রতিষ্ঠান কী তা বুঝিয়ে দিতে হবে।
— নিজের সর্বনাশ করেছিলে।
— তা-ই মনে করো?
— তোমার রক্তের ভিতরে লেখার নেশা ঢোকেনি, তাই সাহিত্য ত্যাগ করে বহুজাতিকের দ্বারে গেলে।
চুপ করে ছিল অভীক। এত দিন বাদে লেখক বন্ধুর শরণাপন্ন হওয়া কেন? লিখবে আবার, তাই। যদি লিখেই যেত, এত দিনে সে অনেকটা পথ পার হতে পারত। এখন যেন আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। যা লিখেছিল এক সময়ে, তার কথা ভুলে গেছে পাঠক। নতুন প্রজন্ম তাকে চেনে না। চিনলেও হয়তো জানে, মৃত লেখক। মৃত লেখক আর লেখে না যেমন, তেমনই সে-ও আর লিখবে না। এখন আবার শুরু করলে, বলবে নতুন লেখক। নামটা বদলে নিন। অভীক দাস একজন ছিলেন।
