বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিñিদ্র নিরাপত্তা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি গতকাল রবিবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক বিষয়ে অয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আগাম প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিনির্ভর সার্বক্ষণিক নিবিড় তদারকির ফলেই এ বছর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত শান্তিময় পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন হয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতেও বজায় থাকবে বলে আশা করি। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করতে নিরলসভাবে কাজ করা পুলিশ, বিজিবি, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকসহ সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিগত ১৫-১৭ বছর ধরে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নানাবিধ অপ্রীতিকর ঘটনা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনাশের চেষ্টা দেখা যেত, তবে বর্তমান সরকার দেশকে সেই অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত করতে পেরেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, এবার ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। ডিজিটাল অ্যাপস ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সার্বক্ষণিক তদারকি করার ফলে অশুভ চক্রের দু-একটি সম্ভাব্য নাশকতামূলক পরিকল্পনা পূর্বেই উদ্ঘাটন ও নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক ৩৩,৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উৎসবকে আরো আনন্দমুখর করতে সরকার নানা প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পূর্বে যেখানে সরকারি বরাদ্দ ছিল সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা, তা বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী এ বছর ৫ কোটি টাকায় উন্নীত করেছেন। এছাড়া প্রতিটি মণ্ডপের জন্য চালের বরাদ্দ ১০০ কেজি বাড়িয়ে ৬০০ কেজি করা হয়েছে। একইসঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটিসহ এ বছর পূজায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা টানা ৫ দিনের ছুটি উপভোগ করেছেন, যার মধ্যে ৩ দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগ একটি ঐক্যবদ্ধ ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়ে তোলার সরকারি আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মন্ত্রী অভিহিত করেন।
আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, এটি রাজনৈতিক সমঝোতা ও আন্দোলনের মূল অঙ্গীকার ছিল। সর্বোচ্চ আদালত থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী সম্পর্কিত যে রায় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক দিয়েছিল সেটা বাতিল করেছে এবং জুডিশিয়ালি সেটা রিভাইভ (পুনর্বহাল) করেছে। লেজিসলেচার বা আইনসভার মাধ্যমে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল ও প্রতিস্থাপন করা হবে।
গোপালগঞ্জ সদরের খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু সন্ত্রাসী টহলরত পুলিশের ওপর হামলার অপচেষ্টা চালায়। সংখ্যায় কম থাকায় পুলিশ আক্রান্ত হলেও ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে ইতিমধ্যেই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের (সাজেক) সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, সেখানে একাধিক ক্ষুদ্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমে কিছতা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়াসহ স্থানীয় নেতৃত্ব যৌথভাবে রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন।
পূজার ছুটির মধ্যে একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাসভবনে অভিযান এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৮৫ জনকে সাজা দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার পরিচয় বিবেচনা না করে তাকে ইতিমধ্যেই সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিভাগীয় মামলাসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা ও বিদেশে দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ফেরত পেতে আইন ও এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশকে একাধিকবার অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চাইলেও গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া গণহত্যাকারী বা কোনো পলাতক অপরাধীকে দেশে নতুন করে কোনো অপতৎপরতা চালাতে দেওয়া হবে না।
বিআলো/অর্নব