গায়েহলুদের আনুষ্ঠানিকতা শেষ। বাড়িজুড়ে চলছিল উৎসব আর গান-বাজনা। রাত পোহালেই বিয়ে। আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে বাড়ির আঙিনা। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। কনের বাড়িতেও বর বরণের জন্য তৈরি করা হয়েছে সুসজ্জিত ফটক। দুই পরিবারে বইছিল আনন্দের বন্যা।
কিন্তু, সেই আনন্দের আড়ালে যে এমন নির্মম পরিণতি অপেক্ষা করছিল, তা কেউ কল্পনা করতে পারেননি। হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিয়ের আগের রাতে বরের আকস্মিক মৃত্যুতে নিমিষেই শেষ হয়ে যায় সব আনন্দ। আলোকসজ্জায় ঝলমলে বিয়েবাড়িতে নেমে আসে বিষাদের অন্ধকার। শোক আর আহাজারি পাড়াজুড়ে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গাইবান্ধা পৌর শহরের ডেভিড কোম্পানি পাড়ায়। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বাদ জুমা দাফন সম্পন্ন হয়।
মৃত আরিফ শাহরিয়ার সৌমিক ওই এলাকার সুলতান মিয়ার ছেলে। মেধাবী এই তরুণ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। কনের বাড়ি সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আরিফ শাহরিয়ার সৌমিক প্রায় এক মাস আগে ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় আসেন। চার দিন ধরে তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। এর মধ্যেই চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি। কিন্তু, বৃহস্পতিবার সকালে তার শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। দ্রুত তাকে চিকিৎসার জন্য গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতাল-সংলগ্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বেলা ১টার দিকে ডা. মনির হোসেন মুরাদ তাকে ব্যবস্থাপত্র দেন।
একই দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সৌমিক অসুস্থ বোধ করলে তাকে আবারো গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
যে ভাইকে বিয়ের সাজে দেখার কথা ছিল, সেই ভাইকে কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে বিদায় দিতে হয়েছে বড় বোন শারমিন সুলতানাকে। শুক্রবার দুপুরে শারমিন সুলতানা সাংবাদিকদেরকে বলেন, “শরীরে জ্বর নিয়েই গায়ে হলুদের পর্ব শেষ হয়েছিল। পরিবারের সবাই ভেবেছিল, চিকিৎসা ও বিশ্রামে সুস্থ হয়ে উঠবে। পরদিন প্রিয় মানুষটিকে জীবনসঙ্গী করে নতুন জীবনের পথে পা বাড়াবেন। কিন্তু, নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।”
যে বাড়িতে বিয়ের সানাই বাজবার কথা ছিল, সেখানে এখন শোকের মাতম। যে তরুণের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হওয়ার কথা ছিল, হঠাৎ করেই নিভে গেল সব। আর যে তরুণীকে ঘিরে ছিল নতুন সংসারের স্বপ্ন, তার জীবনটাও আঁধারে ঢেকে গেল।
শারমিন সুলতানা বলেন, “সৌমিক অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। সামনে ছিল তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত। পড়াশোনা শেষ করে জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এবার শুরু হওয়ার কথা ছিল দাম্পত্য জীবনের নতুন অধ্যায়। কিন্তু, বিয়ের আগের দিনই সব স্বপ্ন যেন থমকে গেল। যে ভাইয়ের হাতে বিয়ের পর নতুন সংসারের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা ছিল, তার কফিনবন্দি হওয়ার খবর মেনে নিতে পারছি না কেউই।”
পরিবারের কাছে সৌমিক ছিলেন শুধু একজন সন্তান বা ভাই নন, ছিলেন আশা-ভরসার প্রতীক। তার ভবিষ্যৎ ঘিরে ছিল নানা পরিকল্পনা। বিয়ের আয়োজনের মধ্যে দিয়ে সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ, কয়েক দিনের ব্যবধানে সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
