বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, নেমে এসেছে বার্ধক্য। ঠিকমতো চলাফেরা করার শক্তিটুকুও নেই। হাতে একটি লাঠি ভর করে কোনোরকমে এক পা, দুই পা এগিয়ে চলেন ৭০ বছর বয়সী সার বানু। অন্যদিকে তাঁর ৮০ বছর বয়সী স্বামী এরশাদ আলীও অসুস্থ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে সন্তানদের সেবা-যত্নে একটু শান্তিতে দিন কাটানোর কথা, সেখানে তাঁদের দিন কাটছে চরম অসহায়ত্ব, অনিশ্চয়তা আর অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। এলাকার কেউ দয়া করে কিছু দিলে তবেই জ্বলে তাঁদের ঘরের চুলা।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের কাশেম বাজার গ্রামের বাসিন্দা সার বানু ও তাঁর স্বামী এরশাদ আলী। তাঁদের সংসারে রয়েছে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। কিন্তু অভিযোগ, সন্তানদের কেউই তাঁদের নিয়মিত খোঁজখবর নেন না কিংবা প্রয়োজনীয় দেখাশোনা করেন না। ফলে জীবনের এই শেষ বয়সে এসে অসহায় এই দম্পতিকে অনেকটা একাকীই দিন পার করতে হচ্ছে।
একসময় হয়তো তাঁরাও স্বপ্ন দেখেছিলেন, সন্তানদের নিয়ে সুখে-শান্তিতে কাটবে তাঁদের শেষ জীবন। অসুস্থ হলে সন্তানরা পাশে দাঁড়াবে, একটু কষ্ট হলে সান্ত্বনা দেবে, দুমুঠো খাবারের অভাব হবে না। কিন্তু বাস্তবতা যেন তাঁদের সেই স্বপ্নকে নির্মমভাবে ভেঙে দিয়েছে। আজ বার্ধক্যের ভারে যখন নিজের শরীরটুকু সামলানোই কঠিন, তখন পাশে নেই প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো আপনজন।
সার বানুর অবস্থা আরও করুণ। তিনি নিজে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। হাতে লাঠি নিয়ে কোনোরকমে চলাচল করেন। বয়সের ভারে ও শারীরিক অসুস্থতায় তাঁর প্রতিটি দিনই যেন একেকটি সংগ্রাম। অন্যদিকে স্বামী এরশাদ আলীও অসুস্থ হওয়ায় নিজেদের প্রয়োজন মেটানো তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। খাবার সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাপন—সবকিছুতেই তাঁদের অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তাটুকুও নেই তাঁদের জীবনে। প্রতিবেশী কিংবা এলাকার কোনো সহৃদয় ব্যক্তি কিছু খাবার বা সাহায্য দিলে তবেই তাঁদের খাওয়া-দাওয়া হয়। অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করেই চলছে তাঁদের জীবন। বয়সের এই শেষ সময়ে এসে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাটাই যেন তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় চিন্তা।
সন্তানদের নিয়ে যে ঘরে একদিন ছিল আশা-ভরসা, সেই ঘরেই আজ দুজন অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধার জীবন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়। তাঁদের এই অসহায় অবস্থার কথা শুনলে যে কারও হৃদয় ভারী হয়ে উঠবে। জীবনের দীর্ঘ সময় পার করে এসে আজ তাঁরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সামান্য খাবার, একটু যত্ন আর দুটো সহানুভূতির কথা তাঁদের কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।
সার বানু ও এরশাদ আলীর মতো অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্বই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতারও অংশ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকাবাসী, যাতে এই অসহায় দম্পতির জন্য খাবার, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সার বানু ও এরশাদ আলীর চাওয়া-পাওয়ার হিসাব হয়তো খুব বেশি নয়। তাঁদের প্রয়োজন দুবেলা খাবার, অসুস্থ শরীরের একটু চিকিৎসা, আর এমন কিছু মানুষের সঙ্গ—যাঁরা তাঁদের অসহায়ত্বকে অবহেলা না করে পাশে দাঁড়াবেন।
মানবিকতার প্রশ্ন আজ সবার কাছে—জীবনের এই শেষ সময়ে এসে অসহায় সার বানু ও এরশাদ আলীর পাশে দাঁড়াবেন কে?
আজকালের খবর/রাশেদুল মিলন
