নিজস্ব ছবি এই সময়
Published on
:
3 min read
বুদ্ধদেব বেরা মানিকপাড়া
বাম আমলে অনাহারে লোধা-শবরদের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছিল আমলাশোলে। তৃণমূল আমলেও লালগড়ের পূর্ণাপানিতে পুষ্টিকর খাবারের অভাবে লোধা-শবরদের মৃত্যুর অভিযাগ উঠেছিল। শুক্রবার ঝাড়গ্রামের মানিকপাড়ার লোধা-শবর জনজাতি অধ্যুষিত কালাঝরিয়া গ্রামের মাঠে প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই লোধা শবরদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচির সূচনা করলেন।
ঝাড়গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, 'সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা বিভিন্ন পরিচয়ে আপনাদের কাছে এসেছি। আপনারা আমাকে কুটুম বলেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ঝাড়গ্রামে এলাম। তাই কুটুম্বিতা করতে দুর্গাপুজোর পরে আমার আসা। এই সম্পর্ককে এ বার উন্নয়নের সম্পর্কে সম্পৃক্ত করব।' জানালেন, শুধুমাত্র ঝাড়গ্রাম জেলার উন্নয়নে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে ১২১ কোটি টাকার বিশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে রাজ্যের তরফে।
এ দিন ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া এবং আলিপুরদুয়ার জেলাতেও এই কর্মসূচির সূচনা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'রেশনের খাদ্যসামগ্রী ছাড়াও প্রতি সপ্তাহে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে অতিরিক্ত চাল, ডাল, তেল, সয়াবিন-সহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে।'
এদিন হেলিকপ্টারে করে এসে অনুষ্ঠানে যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী। দুপুর বারোটা থেকে প্রায় দেড়টা পর্যন্ত ছিলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে ভিড় উপচে পড়েছিল। কালাঝরিয়া গ্রামে পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচির সূচনার পাশাপাশি একাধিক সরকারি প্রকল্পেরও পরিষেবা তুলে দেন লোধা-শবরদের হাতে।
বনাধিকার পাট্টা, আয়ুষ্মান ভারত, গ্রামীণ রোজগার সুরক্ষা কার্ড গ্রামবাসীদের হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'এখানে যে ত্রিপল ঘেরা বাড়িগুলি রয়েছে, ছয় মাসের মধ্যে তা যেন পরিবর্তন হয়ে যায়। জেলা শাসককে আমি বলব কাজ করে দেখানোর জন্য।' জানুয়ারি মাসে এই গ্রামে এসে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী লোধা-শবর জনজাতির মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় শুনেছিলেন তাঁদের সমস্যার কথা। আশ্বাস দিয়েছিলেন সমস্যা দূর করার।
রাজ্যে সরকার বদলের পরে তাঁর কথা অনুযায়ী গ্রামে পিচ রাস্তা, পানীয় জল এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা হয়েছে। গ্রামের বাসিন্দা মালতি ভুক্তা বলেন, 'জঙ্গলের কাঠ বিক্রি করে সংসার চলে। রাতে ভাত জুটলে, সকালে ভাত জুটত না। এখন সব পাচ্ছি। প্রতি সপ্তাহে ব্যাগভর্তি চাল, ডাল, তেল দেওয়া হলে আর অভাব থাকবে না। উনি আমাদের জন্য যে ভেবেছেন এতেই আমরা অনেক খুশি।' মুখ্যমন্ত্রী জানান, পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে ঝাড়গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ৪৫ হাজার লোধা-শবর জনজাতির মানুষ উপকৃত হবেন।
এ দিন মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্যের প্রতিটি ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক্স রে মেশিন, ইউএসজির ব্যবস্থা করা হবে। ঝাড়গ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে রেফারের হাসপাতাল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, 'এখানে উন্নত হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। যেখানে আইসিইউ-সহ একাধিক উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে।' জেলায় মোট ৬১৬৩ জন আবেদনকারী এখনও অন্নপূর্ণা যোজনার আওযতায় নেই। আবেদনকারীদের সমস্যা দ্রুত সমাধান করে অক্টোবর এবং নভেম্বর দুই মাসের অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা তাঁদের অ্যাকাউন্টে দেওয়ার জন্য জেলা শাসককে নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী।
লোকপ্রসার শিল্পীদের ভাতা বৃদ্ধির আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে লোকপ্রসার শিল্পীদের ভাতার আওতায় আনারও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নাম না করে শুভেন্দু বলেন, 'আগে যিনি ছিলেন তিনি আদিবাসী কুড়মিদের মধ্যে লড়াই লাগিয়েছেন। যাঁর যা সংবিধানিক অধিকার রয়েছে তাঁরা সেই অধিকার পাবেন।' আগামী বাজেটের আগে রাজ্যজুড়ে এক লক্ষ স্থায়ী চাকরির ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এ দিন লোধা-শবর জনজাতির মানুষকে নেশা থেকে দূরে থাকার, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানো এবং অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে বন্ধের আহ্বান জানান প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী রাজেশ মাহাতো। তিনি বলেন, 'জঙ্গলমহলের কুটুম আমাদের দাদা (শুভেন্দু অধিকারী)। জঙ্গলমহল ওঁর হৃদয়ে আছে।'এ দিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু, কৃষি প্রতিমন্ত্রী অমিয় কিন্তু, বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত সাউ-সহ বিনপুর, গড়বেতা, শালবনি, বান্দোয়ানের বিধায়ক, ঝাড়গ্রামের জেলা শাসক আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর, জেলা পুলিশ সুপার মানব সিংলা প্রমুখ।
