ফ্রান্সে বিদ্যালয়ের সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন আনুমানিক ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। এ সময় অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সহিংসতায় আহত হয়েছেন ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ফরাসি সরকার পরিস্থিতিকে সহিংসতার ‘ক্রমবর্ধমান বিস্তার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
প্যারিসে বিকেলে মূল মিছিলটি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। শহরের বিভিন্ন সড়কে আগুন জ্বালানো হয় এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহরের কেন্দ্রস্থলের প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকাতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে পুড়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় প্যারিসে পুলিশকে লাঠি হাতে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করতে দেখা যায়। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে জড়ানো বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যেও মারামারির ঘটনা ঘটে।
বিভিন্ন শহরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর
প্যারিসের বাইরে লিয়ঁ, লিমোজ, মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঙ্গেরসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে।
লিয়ঁ শহরের পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে ‘ট্র্যাজেডি’ বলে বর্ণনা করেছেন শহরটির মেয়র গ্রেগরি দুসে।
বিএফএমটিভিকে তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ও সুপরিচিত ভবনটি শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হওয়ায় এর ক্ষতি তাদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনকারীরা দমকল বাহিনীকে নিরাপদে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেয়।
লিমোজ শহরের পৌরসভা ভবনেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ভবনটির ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সাঁত এতিয়েনে গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত উড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন শহরটির মেয়র রেজিস হুয়ানিকো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘এমন মর্মান্তিক ঘটনা কখনোই ঘটা উচিত নয়।’
এ ছাড়া গ্রেনোবল, আভিনিওঁ, পো, মনপেলিয়ে ও ভ্যালঁস শহরেও বিভিন্ন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্যারিসে পোশাক ও খাবারের দোকানে লুটপাট চালানো হয়। লিল শহরে অ্যাপলের একটি দোকানে ঢুকে সব পণ্য লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের সত্যতা যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ পরা কয়েকজন ব্যক্তি গ্রেনোবলের শহরের কেন্দ্রস্থলের সরু সড়ক দিয়ে একটি পর্যটকবাহী ট্রেন চালিয়ে অন্তত তিনজন দাঙ্গা পুলিশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষা সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-কর্মীর সংকট এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করছেন। দেশটিতে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।
শনিবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য প্রতিবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা। তাদের মধ্যে ছিল ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের কর্মীরাও। ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল এবং ফ্রান্সের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ আন্দোলনগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একদল তরুণ বিবিসিকে বলেন, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন চান। কিন্তু তাদের ভাষায়, ‘আমরা শুধু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি, অথচ কিছুই এগোচ্ছে না।’
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই সহিংসতা
ফ্রান্সে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ নতুন ঘটনা নয়। তবে এবারের পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন দেশটি গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আগামী বছর দায়িত্ব ছাড়বেন। জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা মেরিন লে পেন এবং কট্টর বামপন্থী লা ফ্রঁস ইনসুমিজ দলের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
মেলঁশোঁ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ওপর ‘ঝাঁপিয়ে পড়ার’ অভিযোগ তোলেন। তবে তিনি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগেরও নিন্দা জানান। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু তার মন্তব্যকে ‘বিপজ্জনক ও নিন্দনীয়’ বলে অভিহিত করেন।
লেকর্নু বলেন, পুলিশকে তীব্র সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের শক্তি যাচাইয়ের জন্য বিক্ষোভকে ‘প্রস্তুতিমূলক মহড়া’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘কেউ সহিংসতার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না।’
মেরিন লে পেন অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীদের ‘ন্যায্য দাবিগুলোকে’ কট্টর বামপন্থীরা জিম্মি করেছে। সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য তিনি মেলঁশোঁকে দায়ী করেন।
প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেছেন, যারা প্রশাসনিক কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পৌরসভায় হামলা চালিয়েছেন এবং লুটপাট করেছেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।
সরকারের উদ্যোগেও থামছে না বিক্ষোভ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অতিরিক্ত ৩ হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে সরকারের এই উদ্যোগের পরও বিক্ষোভ থামেনি; বরং তা আরও তীব্র হয়েছে। শিক্ষা খাতের সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
