ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে ক্ষতির শিকার বাংলাদেশ
পদ্মা নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছের প্রজাতি। ইলিশ-পাঙ্গাস-চিতল-বোয়ালের ঝাঁকও আর দেখা যায় না। গঙ্গার বুকে ফারাক্কার অপরিণামদর্শী ব্যারেজের কারণে এই ক্ষতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ।
# ইলিশ-পাঙ্গাস-চিতল-বোয়ালের ঝাঁকও আর দেখা যায় না
বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী
পদ্মা নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছের প্রজাতি। ইলিশ-পাঙ্গাস-চিতল-বোয়ালের ঝাঁকও আর দেখা যায় না। গঙ্গার বুকে ফারাক্কার অপরিণামদর্শী ব্যারেজের কারণে এই ক্ষতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ।
অর্ধ শতাব্দী কাল যাবত ফারাক্কা ব্যারেজ হয়ে আছে গঙ্গা-পদ্মার মৃত্যু ফাঁদ। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের পদ্মার প্রশস্ততা ও গভীরতা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষময় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মাছের ভা-ার বলে খ্যাত পদ্মা নদীতে স্থানীয় অনেক সুস্বাদু মাছ আর আগের মতো পাওয়া যায় না। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, একসময় রাজশাহীর পদ্মায় ছিল মাছের প্রাচুর্য। গোদাগাড়ী থেকে চারঘাট পর্যন্ত নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় জেলেদের জালে ধরা পড়তো ইলিশ, পাঙ্গাস, বোয়াল, চিতল, বাঘাইড়সহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। বিশেষ করে রাজশাহীর পবা ও গোদাগাড়ীর পদ্মায় একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়া যেত। আকারেও মিলত মাঝারি থেকে বড় ইলিশ। তবে সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। পদ্মার বুকে কমেছে পানির প্রবাহ ও গভীরতা, বেড়েছে চর ও বালুর আধিক্য। নদীতে মাছের প্রাপ্যতাও কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। ইলিশের পাশাপাশি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে দেশীয় মাছের বহু প্রজাতি। এর প্রভাব পড়েছে নদীনির্ভর জেলেদের জীবন-জীবিকাতেও।
মাছের জন্য হুমকি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব, নদীতে পানির প্রবাহ ও গভীরতা কমে যাওয়া, প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া এবং কৃষিতে অপরিকল্পিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারসহ নানা কারণে পদ্মার মাছের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে গেছে। শুধু নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়াই নয়, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও দেশীয় মাছের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। বর্ষায় এসব জমি, পুকুর ও ডোবার পানি নদীতে মিশে মাছের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গোদাগাড়ী উপজেলার রেলওয়ে বাজার, মৎস্য আড়ৎ ও পদ্মা নদীর পাড় ঘুরে দেখা যায়, নদীর মাছের উপস্থিতি খুবই কম। সামান্য কিছু নদীর মাছ থাকলেও অধিকাংশ মাছই পুকুরে চাষ করা কাতল, রুই, তেলাপিয়া, কৈ ও পাবদা। নদীর মাছ কমে যাওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক ক্রেতাও এখন আর আগের মতো মাছ কিনতে আসছেন না। বাজারে প্রতি কেজি পাঙ্গাস মাছের দাম পড়ছে প্রায় ৪০০-৮০০ টাকা। বাঘাইড় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ১০২০ টাকা দরে।
ইলিশ আসে না কেন?
গবেষকরা বলছেন, পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় স্রোতও কমেছে। ফলে এখন ইলিশ সেভাবে নিচু এলাকা থেকে উজানে আসে না। বিশেষত নদীতে পানির গভীরতা কমে যাওয়া, বাঁধ দেয়া এবং ফিল্টারেশন বেশি হওয়ারÑ অর্থাৎ ড্রেজিংয়ের কারণে পানিতে বালুর পরিমাণ বেড়ে পানি ঘোলা হয়ে যাওয়ার কারণে ইলিশের আগমন কমে গেছে। গবেষকদের মতে, পানির গভীরতা ২০ থেকে ২৫ ফুট না হলে ইলিশ নদীতে আসতে চায় না। পদ্মায় পানির গভীরতা ও স্বাভাবিক স্রোত কমে যাওয়ায় ইলিশের উজানে আসার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর আগে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পদ্মায় প্রতি সেকেন্ডে পানি প্রবাহিত হতো ৯ হাজার ৩২ ঘনমিটার। বাঁধ চালুর পর, অর্থাৎ ১৯৭৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পানির প্রবাহ নেমে এসেছে ৫ হাজার ১৪৬ ঘনমিটারে। পানির এই পরিবর্তন শুধু ইলিশের ওপর নয়, পদ্মার অন্যান্য দেশীয় মাছের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে বলে গবেষকরা মনে করছেন। রাজশাহী জেলায় গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চারটি উপজেলায় ৫ দশমিক ৩৭ টন ইলিশ ধরা পড়ে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাড়ে ২৮ টন ইলিশ ধরা পড়লেও পরের বছর থেকেই ইলিশ আহরণ কমতে শুরু করে। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে রাজশাহীতে ইলিশের আহরণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মায় দেশীয় ৭৭ প্রজাতির মাছের মধ্যে তিনটি প্রজাতির অবস্থা সংকটজনকভাবে বিপন্ন, ১০টি প্রজাতি বিপন্ন, নয়টি প্রজাতি অতি বিপন্ন এবং আরো নয়টি প্রজাতি বিপন্ন প্রায় অবস্থায় রয়েছে। পদ্মা থেকে হারিয়ে যাওয়া মৎস্য প্রজাতির ৬০ শতাংশই এখন বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। অর্থাৎ নদীর পানি কমে যাওয়া, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্য সংকট, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে একের পর এক দেশীয় মাছের প্রজাতি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ইলিশ দ্রুত বেগে ছোটে এবং উজানের দিকে যেতে পছন্দ করে। এ মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে চলাচল করে। পাকিস্তান আমলেও বঙ্গোপসাগর থেকে উজানে রাজশাহী হয়ে ভারতের ভাগলপুর পর্যন্ত ইলিশ যেত এবং ডিম ছাড়তো। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর রাজশাহীতে ইলিশ কমতে থাকে। তিনি বলেন, বাঁধের কারণে পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় স্রোতও কমে গেছে। ফলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম করে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ১৯৭৪-৭৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যেত। তবে আশির দশক থেকেই পদ্মায় ইলিশের পরিমাণ কমতে থাকে।
