নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীতে বাড়ছে মশার উপদ্রব, সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন, নালা, অলিগলি থেকে শুরু করে বসতবাড়ির আশপাশে মশার ঘনত্ব বেড়েছে। নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর দাবি করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবে বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৫ হাজার ৬০১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৫৬ জন এবং মারা গেছেন ৩৩ জন। অর্থাৎ দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৫ শতাংশই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নালা-নর্দমা ও জমে থাকা পানির পাশাপাশি বাসাবাড়ির আশপাশেও মশার উপস্থিতি বেড়েছে। কীটতত্ত্ববিদদের হিসাবে, ঢাকায় এডিস ও কিউলেক্স মশার লার্ভার ঘনত্ব এখন ৩০-এর ঘরে। গত বছরের তুলনায় এ বছর লার্ভার উপস্থিতি প্রায় তিন গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ অবস্থায় ডেঙ্গুর পাশাপাশি সাধারণ মশার উপদ্রবও নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত লার্ভিসাইডিং ও ফগিং চালানোর কথা জানিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শন, লার্ভা শনাক্তকরণ, চিরুনি অভিযান এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারির কথাও বলা হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মশার প্রকোপ অব্যাহত থাকায় শুধু অভিযান বা পরিদর্শনের প্রচারে না থেকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান দাবি করেছেন, মশকনিধনে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। ডেঙ্গুতে মৃতদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি দুটি নতুন কীটনাশক আনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে সেগুলোর মাঠপর্যায়ে ব্যবহার কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানাননি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালামও তাঁর এলাকার মশা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তাঁর কার্যালয়ের সামনেই মশার উপদ্রবের বিষয়টি জানানো হলে তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তবে সিটি করপোরেশনের দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, আগামী দুই থেকে তিন দশক ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গু বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হয়ে থাকতে পারে।
তাঁর মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত দক্ষ কীটতত্ত্ববিদের অভাব এবং আধুনিক পরীক্ষাগারের ঘাটতি মশা নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা।
তিনি জানান, ঢাকার মতো একটি বড় শহরের জন্য অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন কীটতত্ত্ববিদ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে এ সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন।
মশকনিধন কার্যক্রমে দক্ষ জনবলের ঘাটতিকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কীটনাশকের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং পরিবেশভেদে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছাড়া শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মত তাঁদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ছাড়া রাজধানীতে টেকসইভাবে মশার বিস্তার ঠেকানো কঠিন।
নগরবাসীর অভিযোগ ও ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি বলছে, মশকনিধনে শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কার্যকর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ। অন্যথায় রাজধানীতে মশার উপদ্রব আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
