দেশের নিরাপত্তার মূল্য সব সময় সীমান্তে দেখা যায় না। কখনও তা দেখা যায় সন্তানের জন্মদিনে বাবার জন্য খালি রাখা চেয়ারটিতে। কখনো স্কুলের অভিভাবক সমাবেশে একটি ছোট্ট মেয়ের বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকায়। কখনও বিবাহবার্ষিকীর সন্ধ্যায় এক স্ত্রীর নিঃসঙ্গ অপেক্ষায়, কিংবা অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের শিয়রে সন্তানের না-থাকায়। এসব শূন্যতার পেছনে একটিই বাস্তবতা। পরিবারের প্রিয় মানুষটি তখন দেশের কোনো দুর্গম সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরায়। তিনি পাহারা দেন দেশের ভূখণ্ড, আর শত শত মাইল দূরে তার পরিবার আগলে রাখে ভালোবাসা, দায়িত্ব আর অপেক্ষার এক নিঃশব্দ সংসার।
আমরা সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিককে দেখি, তার সাহসের কথা বলি, কর্তব্যনিষ্ঠায় গর্বিত হই। কিন্তু খুব কমই ভাবি, সেই সাহসের পেছনে কতজন মানুষ প্রতিদিন নিজেদের ছোট ছোট আনন্দ, স্বপ্ন আর স্বস্তি নিঃশব্দে বিসর্জন দিচ্ছেন। মায়ের উদ্বেগ, স্ত্রীর একাকিত্ব, সন্তানের অভিমান মিলিয়ে গড়ে ওঠে ত্যাগের এমন এক ইতিহাস, যার কোনো পরিসংখ্যান নেই, কোনো স্মারক নেই, কোনো পদকও নেই। অথচ এই অদৃশ্য অবলম্বনই একজন সৈনিককে প্রতিকূলতার মধ্যে দায়িত্ব পালনের সাহস জোগায়।
বাংলাদেশের সীমান্তের ভূপ্রকৃতি বিচিত্র। কোথাও অরণ্যে ঘেরা উঁচু পাহাড়, কোথাও নদী ও চরাঞ্চলের জনবিরল প্রান্তর। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বাবুছড়া ব্যাটালিয়নের পূর্ব লক্ষাছড়া বিওপির আশপাশের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো জনবসতি নেই। সেখানে পৌঁছাতে হয় ঝিরি আর পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। এমন দুর্গম কর্মস্থলে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা আর সীমিত যোগাযোগ সৈনিকজীবনের কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু সেই দূরত্বের অন্য প্রান্তে যে পরিবার অপেক্ষা করে, তাদের জীবনও কম কঠিন নয়। সেখানে একটি ফোনের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, অনেক রাত কেটে যায় না-বলা শঙ্কায়।
মা প্রতিদিন ভাবেন, সন্তান ঠিকমতো খেয়েছে কি না, অসুস্থ হলে কে তার কপালে হাত রাখবে। নিজের অসুখের খবর জানতে চাইলে হয়তো হেসে বলেন, ‘ভালো আছি।’ বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের সান্নিধ্য তারও প্রাপ্য। তবু বুকের ভেতরের উদ্বেগ চাপা দিয়ে বলেন, ‘দেশের খেয়াল রাখিস।’ এই বাক্যটি শুধু আশীর্বাদ নয়; এ ভালোবাসার এক কঠিন সংযম। নিজের আবেগের ঊর্ধ্বে সন্তানের কর্তব্যকে স্থান দেওয়ার এক অসাধারণ শক্তি। যে মা সন্তানকে কাছে পেতে চান, তিনিই তাকে দেশের দায়িত্বে অবিচল থাকার সাহস জোগান।
স্ত্রীর আত্মত্যাগের রয়েছে আরেক গভীর মাত্রা। সংসারের আয়ব্যয়ের হিসাব, সন্তানের পড়াশোনা, অসুস্থতার রাত, বৃদ্ধ স্বজনের চিকিৎসা, জরুরি সিদ্ধান্ত, সবই অনেক সময় একা সামলাতে হয় তাকে। বিবাহবার্ষিকী আসে, স্বামী আসেন না। সন্তানের জন্মদিনে কেক কাটা হয়, কিন্তু পাশের আসনটি খালি থাকে। আনন্দের আয়োজন সম্পন্ন হয় ঠিকই, কিন্তু স্বামীর অনুপস্থিতির শূন্যতা থেকে যায় তার একান্ত অনুভবে। দূরের ফোনে তার উত্তর, ‘সব ঠিক আছে।’ এই তিনটি শব্দের ভেতরে জমে থাকে এমন অসংখ্য দিন ও রাত, যখন আসলে কিছুই সহজ ছিল না।
এই নারীর ক্লান্তি কেবল কাজের চাপে নয়। কখনো সমাজের অযাচিত কৌতূহলও তার নিঃসঙ্গতাকে আরও গভীর করে। কোথায় গেলেন, কার সাহায্য নিলেন, স্বামী কবে ফিরবেন, এসব প্রশ্নের জবাবদিহি যেন তারই দায়িত্ব। অথচ সংসার আগলে রাখা কোনো নারীর প্রাপ্য নজরদারি নয়, আস্থা ও মর্যাদা। একজন সৈনিকের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা শুরু হতে পারে তার স্ত্রীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে।
সবচেয়ে নিষ্পাপ বঞ্চনা সন্তানের। স্কুলের অভিভাবক সমাবেশে বাবার চেয়ার খালি। পরীক্ষায় ভালো ফলের আনন্দ জানাতে হয় ফোনের ওপাশে। জ্বরের রাতে কপালে বাবার স্নেহের হাতটুকু পাওয়া হয় না। বাবার ছুটিতে বাড়ি ফেরা যেমন উৎসব, বিদায়ের মুহূর্ত তেমনি আরেক অনিশ্চিত অপেক্ষার শুরু। ছোট্ট হাতে বাবার শার্টের কোণ আঁকড়ে ধরা শিশুটিকে তখন বোঝানো যায় না, কেন বাবাকে আবার যেতে হবে। শৈশব তো কারও ছুটির অপেক্ষায় থেমে থাকে না। এই শিশুকে শুধু গর্ব করতে শেখালে চলবে না; বাবাকে কাছে না পাওয়ার অভিমান প্রকাশের অধিকারও তাকে দিতে হবে।
তবে পরিবারগুলোকে শুধু বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি ভাবলে তাদের মহত্ত্বকে খাটো করা হয়। ব্যক্তিগত কষ্ট সত্ত্বেও তারা সংসারকে স্থির রাখে, প্রিয় মানুষটিকে সাহস দেয়। মা যখন দোয়া করেন, স্ত্রী যখন নিশ্চিন্ত করেন, সন্তান যখন ফেরার দিন গোনে, সেই ভালোবাসা সীমান্তে থাকা সৈনিককে মনে করিয়ে দেয় তার দায়িত্বের গভীর অর্থ। নিজের ঘরের প্রতি মমতাই তখন দেশের অগণিত ঘরের নিরাপত্তার অঙ্গীকারকে দৃঢ় করে। দেশপ্রেমের এই রূপ উচ্চকণ্ঠ নয়, তবু গভীর ও মহিমান্বিত।
আমরা সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধের সাফল্য গণনা করি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে বাদানুবাদ দেখে বিজিবি জাওয়ানদের জন্য গর্ব বোধ করি, পুশইন প্রতিরোধে বাহিনীর সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করি কিন্তু কত রাত একটি পরিবার দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম কাটিয়েছে, তার কোনো হিসাব রাখি না। এই অবদানকে স্বীকৃতি দিতে শুধু প্রশংসা যথেষ্ট নয়। জরুরি চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সহায়তা, নিয়মিত যোগাযোগ ও সম্ভব হলে পারিবারিক পুনর্মিলনের সুযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিবেশী ও আত্মীয়দেরও পাশে দাঁড়াতে হবে সহমর্মিতায়, কৌতূহলে নয়। ত্যাগকে মহিমান্বিত করার অর্থ কষ্টকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া নয়; বরং তা কমানোর দায় স্বীকার করা।
সীমান্তের সৈনিকের প্রতি আমাদের স্যালুট তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তার পেছনের মানুষগুলোকেও সমান শ্রদ্ধায় স্মরণ করব। কারণ দেশপ্রেমের সব ইতিহাস পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা সীমান্তের প্রহরায় লেখা হয় না। কিছু ইতিহাস লেখা হয় মায়ের নীরব দোয়ায়, স্ত্রীর অবিচলতায়, সন্তানের অপূর্ণ আবদারে। আমরা যে ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাই, সেই ঘরের নিরাপত্তায় অবদান রাখতে অন্য কোথাও একজন সৈনিক জেগে থাকেন। আর তাকে জেগে থাকার শক্তি জোগায় দূরের সেই ঘর, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা কখনও ফুরোয় না।
লেখক: সাঈফ ইবনে রফিক, কবি ও সাংবাদিক
(মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। স্টার নিউজ কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।)
