চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তীব্র গরমে রেকর্ড ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
গবেষণা অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপ নগরাঞ্চলে আরও প্রায় ৩২ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। দিনের তীব্র গরম শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, আর উষ্ণ রাতেও শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সুযোগ পায়নি।
ইউরোপের ৮৫৪টি শহরে তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এ মৃত্যুর হিসাব তৈরি করেছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, এ বছর গরমে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। টানা তাপপ্রবাহের কারণে প্রাণহানি গত দুই বছরের প্রতিটির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গবেষণার সহলেখক ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক ম্যালকম মিস্ট্রি বলেন, ৮৫৪টি শহরে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সত্যিই উদ্বেগজনক। তবে এর চেয়েও বেশি শঙ্কার বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর কত বড় অংশের জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী।
গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি গ্রীষ্মে তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় ৬৫ শতাংশের পেছনে ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। শতাব্দীর শুরুর দিকে এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।
মাল্টা, ইতালি ও হাঙ্গেরিতে গরমে মৃত্যুর হার ছিল সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সর্বাধিক ছিল ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে।
মৃত্যুসনদে সাধারণত মৃত্যুর পেছনে থাকা সব কারণ উল্লেখ করা হয় না। ফলে তীব্র গরমের কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা ফুসফুসের ক্যানসারে ভোগা কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলেও তা নথিভুক্ত না-ও হতে পারে। এ কারণে স্বজনেরা অনেক সময় জানতে পারেন না যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন তাঁদের প্রিয়জনের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।
যুক্তরাজ্যের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী কেটি হোয়াইট বলেন, “এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে এমন হাজারো পরিবার, যারা জলবায়ু সংকটের কারণে এ গ্রীষ্মে প্রিয়জনকে হারিয়েছে।” গবেষকদের হিসাবে, শুধু যুক্তরাজ্যেই এ গ্রীষ্মে গরমে ৪ হাজার ৩৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর ছিল ইতালির নেপলস। বয়সের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে করা হিসাব অনুযায়ী, সেখানে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৮১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে তাপের কারণে।
নেপলসের উত্তরের ওসপেদালে সিটিও হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মারিও গুয়ারিনো জানান, গরমের সবচেয়ে তীব্র সপ্তাহগুলোতে তাঁদের জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা ১৫ শতাংশ বেড়েছিল।
তার ভাষ্য, ওই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল গরমের কারণে বিভিন্ন জটিল স্বাস্থ্যসমস্যার অবনতি। এর পাশাপাশি নিঃসঙ্গতা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
গুয়ারিনো বলেন, গরমের মধ্যে একটি বাড়ির চিলেকোঠায় বসবাস করা ক্যানসারে আক্রান্ত এক মুমূর্ষু রোগীকে তারা হাসপাতালে পেয়েছিলেন। গ্রীষ্মকালে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানোর প্রতিষ্ঠান না পাওয়ায় তার পরিবার এ ব্যবস্থা করতে পারেনি।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ৮৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ঘটেছে। তবে তরুণেরাও এ ঝুঁকির বাইরে ছিলেন না। ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৮৩৩ জনেরও গরমের কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
তবে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোতে ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ বসবাস করায়, সেখানকার মৃত্যুর হিসাব দিয়ে পুরো ইউরোপের শহর, ছোট জনপদ ও গ্রামাঞ্চলে তাপজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা নির্ভুলভাবে অনুমান করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
