জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার (ডিইসি) মনীশ গর্গের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সাঁধু ও বিবেক যোশির লেখা চিঠি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের দপ্তরে ফেরত পাঠিয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
ভারতের রাইট টু ইনফরমেশন বা তথ্য অধিকার (আরটিআই) আইনে পাওয়া নথি থেকে এই তথ্য সামনে এসেছে।
আরটিআই আবেদনের জবাবে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চিঠি দুটি সম্পর্কে সিইসি কুমারের মতামত চাওয়ার প্রস্তাব দেয়। পরদিন ৪ আগস্টের আরেকটি নোটে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনাররা চিঠি দুটি ব্যক্তিগতভাবে লিখেছেন। এগুলো ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ নয়।
চিঠি দুটির জবাবে শুধু প্রাপ্তিস্বীকার করা হয়েছিল। ৫ আগস্টের ওই প্রাপ্তিস্বীকারপত্রের অনুলিপি পাঠানো হয় ডিওপিটির সচিব, ওই বিভাগের প্রতিষ্ঠাপন কর্মকর্তা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রধান ব্যক্তিগত সচিবের কাছে।
গত ৩ অক্টোবর হিন্দুস্তান টাইমস প্রথম চিঠি দুটির বিষয়বস্তু এবং সেগুলো ডিওপিটিতে পাঠানোর তথ্য প্রকাশ করে। তবে আরটিআইয়ের জবাবে জানা গেছে, চিঠির অনুলিপি সিইসির কাছেও পাঠানো হয়েছিল।
হিন্দুস্তান টাইমস এর আগে জানিয়েছিল, চিঠি দুটি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নয়, বরং দুই কমিশনার ব্যক্তিগতভাবে পাঠিয়েছিলেন বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা কর্মী অবসরপ্রাপ্ত কমোডর লোকেশ বাত্রাকে দেওয়া নথিতে দেখা যায়, ৪ আগস্টের নোটে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ উল্লেখ করে, এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে ‘হস্তক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
একই সঙ্গে মনীশ গর্গের বিষয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনার জন্য বিষয়টি ডিওপিটির নথিতে সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে আরটিআই আবেদন করেছিলেন বাত্রা।
প্রায় একই ধরনের চিঠি দুটি গত ২৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব টিভি সোমনাথনের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সুখবীর সাঁধুর চিঠির সঙ্গে ২৮ জুলাই গর্গের জারি করা একটি আদেশের অনুলিপিও ছিল। ওই আদেশে নিজের এবং নির্বাচন কমিশনের অন্য কর্মকর্তাদের কাজ বণ্টন করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহাপরিচালক সীমা খান্না এবং উপনির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমার।
তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ফাইল পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ
হিন্দুস্তান টাইমসের ৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমা খান্নার অধীন তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ফাইল পাঠানোর পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি ছিল দুই নির্বাচন কমিশনারের। এর আগে এসব ফাইল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে পাঠানো হতো।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানো গোপনীয় চিঠিতে দুই কমিশনার অভিযোগ করেন, ২৮ জুলাই প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব পান মনীশ গর্গ। ওই বিভাগের উপনির্বাচন কমিশনার ভানু প্রকাশ ইয়েতুরু ৯ আগস্ট পর্যন্ত ছুটিতে ছিলেন।
চিঠিতে বলা হয়, অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গর্গ তার সমপর্যায়ের ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাজের দায়িত্ব বণ্টন করে একটি আদেশ জারি করেন। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এ ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার আইনটির ১৮(১) ও ১৮(২) ধারা উল্লেখ করেন দুই কমিশনার। বিবেক যোশি আরও অভিযোগ করেন, প্রশাসন বিভাগ থেকে তিনি একটি ফাইল চাইলেও তা তাকে দেওয়া হয়নি।
আরটিআইয়ের জবাবে শুধু অনুলিপি পাঠানোর তথ্য
‘কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে’—বাত্রার এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য কর্মকর্তা চিঠি দুটির প্রাপ্তিস্বীকার এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে সেগুলোর অনুলিপি পাঠানোর তথ্য উল্লেখ করেন।
চিঠি দুটি এবং এর জবাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও সীমা খান্নাকে ঘিরে চলমান বিতর্কের কারণে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, খান্নার উদ্যোগে চালু করা এবং নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত নতুন তথ্যপ্রযুক্তি প্রোটোকল বা ব্যবস্থার কারণে ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার হারান নাম অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। এসব কর্মকর্তা হলেন নির্বাচনী নিবন্ধন কর্মকর্তা (ইআরও)।
ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল এবং বিবেক যোশি ও সুখবীর সান্ধু বিভিন্ন সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।
তবে নির্বাচন কমিশন এ দাবি অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, নিয়ম মেনেই সব সিদ্ধান্ত হয় সর্বসম্মতিক্রমে, নয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে। সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস